বিপ্লবী নাকি ডাকাত!‌ অনন্ত যেন অন্তহীন প্রশ্ন

বিপ্লব মিশ্র

পুজোর আগে একঝাঁক বাংলা ছবি। কোনটা আগে দেখবেন, আর কোনটা পরে দেখবেন, এই ধাঁধার উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই পুজো ফুরিয়ে যায়। ছবিগুলোও হল থেকে উধাও হয়ে যায়। একসঙ্গে এত ছবি মুক্তির আয়োজন কেন, কে জানে!‌

তার থেকে বরং কিছু ছবি আগে বেরিয়ে যাওয়া ভাল। আগস্ট মাস মানেই স্বাধীনতার মাস। একটু দেশাত্মবোধ জড়িয়ে থাকা ছবি মুক্তির আদর্শ সময়। সেদিক থেকে একেবারেই সঠিক সময়কেই বেছে নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন বলতেই উঠে আসে একটি নাম, মাস্টারদা সূর্য সেন। কী বাংলা, কী হিন্দি, তাঁকে নিয়ে বেশ কয়েকটি ছবি হয়েছে। তাতে উঠে এসেছে তাঁর সহযোদ্ধাদের কথাও। এবার সেই সহযোদ্ধাই যেন কেন্দ্রীয় চরিত্র। বরং মাস্টারদা হয়ে উঠেছেন পার্শ্বচরিত্র। তিনি যেন কিছুটা ‘‌বিবেক’‌ এর ভূমিকায়। সেদিক থেকে ভাবনা বেশ অভিনব।

ইতিহাসের কিছু চরিত্রকে এক কথায় চেনানো যায় না। তাঁরা একই সঙ্গে আলো এবং অন্ধকার, আদর্শ এবং বিতর্ক, নায়ক এবং অভিযুক্ত। অনন্ত সিংহ তেমনই এক চরিত্র। মাস্টারদা সূর্য সেনের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অন্যতম নায়ক—আবার স্বাধীনতার পরের জীবনে যাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ডাকাতির অভিযোগ, রহস্য ও বিতর্ক। তাঁর নিজের আত্মজীবনীর নামই ছিল ‘কেউ বলে ডাকাত কেউ বলে বিপ্লবী’। সেই নামেই পথিকৃৎ বসুর ছবি।

ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিষয় নির্বাচন। বাংলা সিনেমায় স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে ছবি কম হয়নি, কিন্তু অনন্ত সিংহের মতো এত জটিল, দ্বন্দ্বময় চরিত্রকে সামনে এনে গল্প বলার চেষ্টা নিঃসন্দেহে সাহসী। পরিচালক ইতিহাসের সঙ্গে কল্পনার মিশেল ঘটিয়েছেন। ষাটের দশকের কলকাতায় একের পর এক ডাকাতি, তার পিছনে রহস্যময় অনন্ত, তাঁকে ধরতে পুলিশের মরিয়া চেষ্টা—এই বর্তমানের সঙ্গে ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে আসে চট্টগ্রাম, সূর্য সেন, অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, কারাবাস, আন্দামান। ফলে ছবিটি নিছক বায়োপিক হয়ে থাকেনি; বরং অনন্তকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক ধরনের থ্রিলারও।

জিৎ এখানে নিজের পরিচিত নায়কসত্তাকে বেশ খানিকটা সরিয়ে রেখেছেন। বয়সের বিভিন্ন পর্যায়ে অনন্তকে ফুটিয়ে তুলতে তাঁর একাধিক লুক বিশেষভাবে চোখে পড়ে। নয়টি আলাদা চেহারার পরিকল্পনা চরিত্রটির দীর্ঘ সময়ের যাত্রাকে বিশ্বাসযোগ্য করার চেষ্টা করেছে। তবে জিতের আসল সাফল্য মেকআপে নয়, চোখে। অনন্ত যখন বিপ্লবী, তখন তাঁর চোখে আগুন। আবার যখন সমাজের চোখে তিনি ডাকাত, তখন সেই চোখেই দেখা যায় এক অদ্ভুত স্থিরতা। তাঁর সংলাপ বলার ধরনেও পরিণত বয়সের অনন্তের ক্লান্তি ও জেদ ধরা পড়ে। টোটা রায়চৌধুরী, লোকনাথ দে, কৌশিক সেন, রজতাভ দত্ত, চন্দন সেন—সবাই মিলে ছবির অভিনয়-ভিত্তিটা শক্ত করেছেন। বিশেষ করে লোকনাথ দে-র মাস্টারদা সূর্য সেন চরিত্রটি ছবির আবেগের অন্যতম কেন্দ্র।

আর এখানেই ছবির একটি বড় সাফল্য—অনন্তকে সাদা-কালোয় না দেখানো। তিনি কি সত্যিই ডাকাত? নাকি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা একজন বিপ্লবী, যিনি স্বাধীনতার পরেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন? পরিচালক সরাসরি উত্তর চাপিয়ে দেন না। বরং দর্শককে প্রশ্নটির সামনে দাঁড় করিয়ে দেন। কিন্তু ছবির দুর্বলতাও এখানেই।

ইতিহাসের এত বড় ক্যানভাসকে আড়াই ঘণ্টার মতো সময়ের মধ্যে ধরতে গিয়ে গল্প অনেক জায়গায় তাড়াহুড়ো করে এগিয়েছে। এক সময়কাল থেকে অন্য সময়কালে যাতায়াত কিছু দর্শকের কাছে বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে। বিশেষ করে স্বাধীনতা-পরবর্তী অনন্ত এবং বিপ্লবী অনন্তের মধ্যে সেতুটি আরও মসৃণ হতে পারত। ছবির শেষভাগের আদালতের দৃশ্যও আরও নাটকীয়ভাবে নির্মাণ করা যেত। সমকালীন সময়কে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রেও কিছু অসঙ্গতি চোখে পড়ে।

আর একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—ইতিহাস ও কল্পনার সীমারেখাটি ছবিতে সবসময় পরিষ্কার নয়। কোনটি নথিভুক্ত ঘটনা, আর কোনটি চিত্রনাট্যের প্রয়োজন থেকে তৈরি—দর্শক সব জায়গায় তা বুঝতে পারেন না। ইতিহাস-নির্ভর ছবির ক্ষেত্রে এই জায়গাটিই সবচেয়ে সাবধানে সামলানো দরকার ছিল।

কিছু দৃশ্যে দক্ষিণী অ্যাকশন ছবির প্রভাবও বেশ স্পষ্ট। ভারী সংলাপ, অতিনাটকীয় মুহূর্ত, নায়কোচিত উপস্থিতি—এসব সাধারণ দর্শককে আনন্দ দেবে ঠিকই, কিন্তু অনন্ত সিংহের মতো বাস্তব চরিত্রের জটিলতাকে আরও সংযতভাবে দেখালে ছবিটি হয়তো আরও গভীর হয়ে উঠত।

তবু সব মিলিয়ে ‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’ গুরুত্বপূর্ণ একটি ছবি। নিখুঁত ইতিহাসের পাঠ নয়, আবার নিছক অ্যাকশন-এন্টারটেনমেন্টও নয়। বরং বিস্মৃত এক মানুষকে নতুন প্রজন্মের সামনে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

Previous post বেঙ্গল টাইমস। ই ম্যাগাজিন। স্বাধীনতা সংখ্যা
Next post সরকারকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে গেলেন আশিস ব্যানার্জি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *