প্রশ্নগুলো সহজ, কিন্তু সহজ কাজটাই এতদিন বেশ কঠিন ছিল

সঞ্জীব রায়

সুমনের গানের লাইন, প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরও তো জানা। কিন্তু কখনও এমন পরিস্থিতি আসে, যেখানে প্রশ্নগুলো সহজ হলেও অনুচ্চারিতই থেকে যায়। কারণ, প্রশ্ন করলেই জুটে যেত দেশদ্রোহীর তকমা। বুঝিয়ে দেওয়া হত, শাসকের উত্তর দেওয়ার কোনও দায় নেই। বরং সে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। পাল্টা তকমা লাগিয়ে দেয়।

বারো বছরের একটা সরকার। অথচ, কোনও ব্যর্থতার দায় নেওয়া এঁদের অভিধানে নেই। এখনও যেন জবাব দেওয়ার দায় জওহরলাল নেহরুর। তেমনই হয়েছিল মূলস্রোত মিডিয়া। তাঁরাও দেশের জনগণকেই যেন শত্রু বানিয়ে বসেছিল। প্রশ্ন করলেই বলা হত, পাকিস্তানে চলে যাও। বোঝানো হত, যাবতীয় ব্যর্থতার দায় সরকারের নয়, বিরোধীদের। আর বিরোধীরাও নানা সমীকরণে ছত্রভঙ্গ। ফলে, গত বারো বছরে তেমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তেই হয়নি মোদি সরকারকে।

একটা সময় ছিল, কোনও মন্ত্রীকে সরাতে হলে দরকার হত বড় রাজনৈতিক দল, বড় মিছিল, বড় নেতা। এখন সেই ছবিটা বদলাচ্ছে। দিল্লির যন্তর মন্তরে কয়েক সপ্তাহ ধরে বসে থাকা একদল তরুণ দেখিয়ে দিল, বড় নেতা ছাড়াও আন্দোলন হতে পারে। দলীয় পতাকা ছাড়াও প্রশ্ন তোলা যায়। আর সরকারকেও শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।

নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে জেন জি-র নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল এই আন্দোলন। সামনে ছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। নামটি যতটা ব্যতিক্রমী, আন্দোলনের ধরনও ততটাই আলাদা। প্রচলিত রাজনীতির ভাষা নয়, সোশ্যাল মিডিয়া, মিম, ইনস্টাগ্রাম পোস্ট, সরাসরি যোগাযোগ—এসবকেই তাঁরা আন্দোলনের হাতিয়ার করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহারের মতো দাবিও মেনে নেয়।

এখানেই এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক। তরুণরা দেখিয়ে দিল, প্রশ্ন করা এখনও সম্ভব। রাজনীতির প্রতি অনাস্থা থাকলেও রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকলে পরিবর্তন আসে না। এত দিন অনেক তরুণের সম্পর্কে ধারণা ছিল—তাঁরা ভোট দেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় মতামত দেন, কিন্তু রাস্তায় নামেন না। জেন জি-র এই আন্দোলন সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তারা বলেছে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস শুধু কয়েকজন ছাত্রের সমস্যা নয়; এটা মেধা, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে প্রতারণা।

আরও গুরুত্বপূর্ণ, আন্দোলনটি কোনও প্রচলিত রাজনৈতিক দলের ছাতার নীচে দাঁড়ায়নি। সেটাই তার শক্তি। কোনও দল ক্ষমতায় গেলে কী হবে, কে প্রধানমন্ত্রী হবেন—এসবের বদলে আন্দোলনের মূল প্রশ্ন ছিল, ব্যবস্থা ঠিকঠাক চলছে কি না। এই জায়গাটি ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গণতন্ত্র শুধু পাঁচ বছর অন্তর ভোট দেওয়ার নাম নয়। সরকারের কাজ নিয়ে প্রশ্ন করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, জবাবদিহি দাবি করাও গণতন্ত্রের অংশ।

জেন জি আরও একটি শিক্ষা দিয়েছে—আজকের আন্দোলনের ভাষা বদলে গেছে। মিছিল আছে, পোস্টার আছে, কিন্তু তার সঙ্গে আছে ইনস্টাগ্রাম, মিম, ভিডিও এবং ডিজিটাল যোগাযোগ। যে প্রজন্মকে অনেকে শুধু মোবাইল–‌নির্ভর বলে ঠাট্টা করেন, তারাই সেই মোবাইলকে প্রতিবাদের শক্তিশালী মাধ্যম বানিয়ে ফেলেছে। তবে এই জয়কে শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে সীমাবদ্ধ রাখলে ভুল হবে। একজন মন্ত্রী চলে গেলেই পরীক্ষাব্যবস্থার সব সমস্যা মিটে যায় না। প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হবে কী ভাবে, পরীক্ষা পরিচালনায় স্বচ্ছতা আসবে কী ভাবে, তদন্ত হবে কতটা নিরপেক্ষ ভাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও প্রয়োজন। সুতরাং জেন জি-র আসল পরীক্ষা এখন শুরু।

তাঁরা যদি শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে থেমে যায়, তা হলে এটি একটি সফল আন্দোলন হয়েই থাকবে। কিন্তু যদি এই আন্দোলন আরও স্বচ্ছ পরীক্ষা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃহত্তর সামাজিক দাবিতে পরিণত হয়, তা হলে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। এই প্রজন্ম রাজনীতিকে হয়তো নতুন কোনও দল দিতে চায় না। বরং রাজনীতিকে একটা পুরনো কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিতে চায়—ক্ষমতায় থাকলেই সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অধিকার পাওয়া যায় না। আর নাগরিক তরুণ হলে তো নয়ই। জেন জি-র সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই—চুপ করে থাকা কোনও বাধ্যবাধকতা নয়। প্রশ্ন করতে হয়। দাবি জানাতে হয়। আর প্রয়োজন হলে ক্ষমতার দরজায় গিয়ে কড়া নাড়তেও হয়। কারণ, গণতন্ত্রে শেষ কথা সরকারের নয়। শেষ কথা নাগরিকের।

Previous post আর্জেটিনার কাছে শিল্পই চাই, গুন্ডামি নয়
Next post অশ্রুতে মিশে ছিল পাহাড়ের হাসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *