রাজ্য রাজনীতি এমন এক আবহে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ভদ্রতা শব্দটা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। হাতে গোনা কিছু ভদ্রলোক যেন শিবরাত্রির সলতের মতো টিমটিম করে জ্বলছেন।
তেমনই এক ভদ্রলোক ছিলেন আশিস ব্যানার্জি। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর এমন অনেকেই বিধানসভায় জিতে এসেছেন, যাঁদের ওই সভার সদস্য ভাবতে কিছুটা কষ্টই হত। যেভাবে স্রোতের অনুকূলে মল, মূত্র, আবর্জনা ভেসে আসে, অনেকটাই যেন সেই রকম। কিন্তু আশিস বাবুকে কখনই সেই গোত্রের মনে যায়নি। তাছাড়া তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর তাঁর আবির্ভাব হয়নি। তৃণমূল গঠিত হওয়ার পর প্রথম বিধানসভা নির্বাচনেই তিনি জয়ী। সময়টা ২০০১। সেবার ৬০ জন জয়ী হয়েছিলেন। পরেরবার সংখ্যাটা কমে দাঁড়াল ৩০। সেবারও তিনি নির্বাচিত। সেই টার্মেই বিধানসভার লবি তে হয়েছিল ভাঙচুর। সেই ভিডিও তে তাঁকে দেখা গেছে। এটা অবশ্যই অস্বস্তিকর একটা ছবি। এছাড়া আর কোনও বিতর্কিত ঘটনায় তাঁকে দেখা যায়নি। মন্ত্রী হয়েছেন, ডেপুটি স্পিকার হয়েছেন। যতটা সম্ভব পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখেছেন।
পালাবদলের এই আবহটা তাঁর মতো মানুষের কাছে সত্যিই বেশ অস্বস্তিকর। কোন শিবিরে থাকবেন, সেটাই যেন মস্তবড় এক দ্বিধা। অন্য অনেকেই তৃণমূলের অপকর্মের শরিক হয়েছেন। তিনি যতটা সম্ভব, নিজেকে এইসব কাজ থেকে দূরে রাখার চেষ্টায় করেছেন। কাউকে কখনো নোংরা ভাষায় আক্রমণ করেছেন বলে মনে পড়ছে না। একজন লেখাপড়া জানা, শিক্ষিত মানুষ যেমন আচরণ করেন, তিনিও তেমনই করেছেন।
আসলে এখনকার রাজনীতিতে এইসব মানুষ সত্যিই বেশ বেমানান। রাজনীতি থেকে মূল্যবোধ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। নিজের দলের চাটুকারিতা করো, অন্য দলের নেতাদের নামে যতখুশি গালমন্দ কারও করো। এটাই যেন টিকে থাকার ও উন্নতির মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আশিস বাবুর পক্ষে এই আবহে মানিয়ে নেওয়া সত্যিই কঠিন। দল হেরে গেল। অন্য সবাই শিবির বদল করলেও তিনি অতি উৎসাহী হয়ে শিবির বাদল করবেন, এমন গোত্রের মানুষ ছিলেন বলে মনে হয় না। তবু ঋতব্রত শিবিরে তাঁকে দেখা গেল কেন? নেপথ্যে নিশ্চিতভাবেই কোনও চাপ বা রহস্য আছে। হয়তো কোনোভাবে বাইরে থেকে কোনও অজানা হুমকি ভেসে আসছিল। হয়তো সামাজিক ও রাজনৈতিক হেনস্থা থেকে বাঁচতেই শিবির বদল করতে হয়েছিল। কিন্তু তাতেও কি হেনস্থা এড়ানো যাচ্ছিল? রাজ্য রাজনীতিতে হাতে গোনা কয়েকজন ডক্টরেট, অধ্যাপকের মধ্যে তিনি একজন। পাঁচ বারের বিধায়ক, মন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার থাকা মানুষটির সামনে হয়তো এমন কোনও অস্বস্তিকর মুহূর্ত তৈরি হচ্ছিল, যা মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না।
তাঁর এভাবে সরে যাওয়া নিছক এক ব্যক্তির আত্ম হনন নয়। একজন আত্ম মর্যাদা সম্পন্ন মানুষের, একজন শিক্ষিত ও ভদ্র মানুষের সরে যাওয়া। তেমন অপরাধ না করেও হেনস্থার আশঙ্কা তাড়া করেছে গত কয়েক মাস। যাঁরা লুকিয়ে থাকার কাজ করেছেন, তাঁদের অনেকেই লুকিয়ে আছেন। কিন্তু তাঁর পক্ষে লুকিয়ে থাকাও কঠিন, আবার প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোটাও কঠিন।
এ এক অদ্ভুত দ্বিধা দ্বন্দ্ব। এখান থেকে বেরিয়ে আসার সহজ কোনও রাস্তাও ছিল না। তাই, চিরতরে হারিয়ে গেলেন। নিশ্চিতভাবেই অনেকে তৃণমূলের দিকে, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর দিকে দোষারোপ করবেন। কিন্তু মুদ্রার অন্য একটি দিকও আছে। আশিস বাবুর মতো একজন শিক্ষিত ও ভদ্রলোকদের পক্ষেও পরিস্থিতি অনুকূল নয়, সেটাও পরিষ্কার। জাভেদ খানদের মতো লোকেরা দিব্যি বুক ফুলিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু আশিস বাবুদের একরাশ গ্লানি নিয়ে বিদায় নিতে হয়। এই দায় সরকারকেও নিতে হবে।
