দিলীপ মাহাত
পুরুলিয়াকে বলা হয় পিছিয়ে পড়া জেলা। আসলে, মূল শহর থেকে দূরে থাকলেই তাকে পিছিয়ে পড়া বলে চিহ্নিত করতে আমরা ভালবাসি। কিন্তু যারা পিছিয়ে পড়া, তাদের এগিয়ে আনার কতখানি চেষ্টা হয়! নাকি পিছিয়ে পড়া বলে আরও পিছিয়ে রাখাটাই দস্তুর!
চাইলে, অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। আমি রেলসংক্রান্ত কয়েকটি তথ্য তুলে ধরতে চাই। তাহলেই বুঝতে পারবেন, পুরুলিয়া কেন পিছিয়ে থাকে। রাজ্যের রাজধানীর সঙ্গে বিভিন্ন জেলার যোগসূত্র আরও নিবিঢ় ও মসৃণ হবে, সেটাই স্বাভাবিক। কলকাতা থেকে পুরুলিয়ার দূরত্ব — কিমি। রেলপথে মোটামুটি সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার পর। অর্থাৎ, খুব দূরে, এমনটা বলা যাবে না। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা আসলে কেমন?
কলকাতায় মূলত তিনটি স্টেশন— হাওড়া, শিয়ালদা ও কলকাতা। এর মধ্যে শিয়ালদা বা কলকাতার সঙ্গে পুরুলিয়ার কোনওরকম সংযোগ নেই। যেটুকু সংযোগ, সবেধন নীলমণি হাওড়ার সঙ্গে। সেই হাওড়া থেকে পুরুলিয়ার প্রথম ট্রেন কখন? শুনলে অবাক হবেন, বিকেল চারটে পঞ্চাশে। সকালের রূপসী বাংলা আগে ছাড়ত হাওড়া থেকে। কিন্তু হাওড়ার প্ল্যাটফর্মে নাকি জায়গা হচ্ছে না। এই অজুহাতে ট্রেনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে সাঁতরাগাছিতে। আরেকটি ট্রেন আছে আরণ্যক এক্সপ্রেস। তারও হাওড়ায় জায়গা হয় না। তাই সেটি ছাড়ে শালিমার স্টেশন থেকে। হাওড়া থেকে প্রথম ট্রেন বিকেল চারটে পঞ্চাশে, পুরুলিয়া এক্সপ্রেস। তারপর শিরোমণি প্যাসেঞ্জার (যদিও সেটি পুরুলিয়া আসে না)। তারপর সেই রাত বারোটা পাঁচে (হাওড়া–চক্রধরপুর)।
রেলকর্তারা একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন। রেলকে যাঁরা চালাচ্ছেন, সেই বিজেপি নেতৃত্বও একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন। হাওড়া স্টেশনে এত হাজার হাজার ট্রেনের জায়গা হয়, শুধু পুরুলিয়ার ট্রেনের জায়গা হয় না। সাতসকালে সাঁতরাগাছি বা শালিমারে গিয়ে ট্রেন ধরা কতটা ঝক্কির, সেটা যাঁদের অভিজ্ঞতা আছে, শুধু তাঁরাই জানেন। যাঁরা কখনও যাননি, তাঁরা আন্দাজ করতেও পারবেন না। অন্যান্য জেলার সঙ্গে হাওড়া, শিয়ালদা দুই স্টেশনেরই মোটামুটি সম্পর্ক রয়েছে। যেমন, উত্তরবঙ্গের ট্রেন শিয়ালদা থেকেও আছে আবার হাওড়া থেকেও আছে। বর্ধমান, বীরভূমও দুটো স্টেশনেরও সুবিধা পায়। দূরপাল্লার ট্রেনও দুটো স্টেশন থেকেই ছাড়ে। কিন্তু পুরুলিয়ার সংযোগ শুধুই হাওড়ার সঙ্গে। সেখান থেকে কিনা বিকেলের আগে কোনও ট্রেন থাকবে না! পুরুলিয়ার ট্রেনকে পাঠিয়ে দিতে হবে সাঁতরাগাছিতে! একই কথা বাঁকুড়া জেলা সম্পর্কেও প্রযোজ্য। সেখানে আসারও প্রথম ট্রেন ওই চারটে পঞ্চাশেই। সকাল দিকে একটা ট্রেন হাওড়া থেকে দেওয়া যায় না! পুরুলিয়ার মানুষ কি এতই হেলাফেলার পাত্র? এটা যদি বঞ্চনা না হয়, তাহলে বঞ্চনার সংজ্ঞা কী?
যাঁরা রেল প্রশাসন চালাচ্ছেন, তাঁদের কি বাংলা মানচিত্র সম্পর্কে ন্যূনতম ধারনাও নেই? তাঁদের একবারও মনে হয় না, সকাল দিকে অন্তত একটা ট্রেন হাওড়া থেকে থাকা দরকার! বাঁকুড়া–পুরুলিয়ায় তো তিনজনের মধ্যে দুজন সাংসদ বিজেপির। অধিকাংশ বিধায়ক বিজেপির। তাঁরাই বা কী করছেন? এটা তো রাজ্যের ব্যাপার নয়। রাজ্য বাধা দিচ্ছে, এমনটাও বলা যাবে না। তাহলে তাঁদের ভূমিকাটা কী?
