স্বরূপ গোস্বামী
যেমন তেমন জায়গা নয়, একেবারে সার্কিট হাউস। কাছেই ডিএমের বাংলো, এসপির বাংলো। অথচ, রাত দশটা নাগাদ সেখানে প্রবল চিৎকার, কান ফাটানো স্লোগান। দাবি, সার্কিট হাউস থেকে সাংসদকে বের করে দিতে হবে।
সেই উন্মত্ত জনতার ক্ষমতা এতটাই, রাত এগারোটা নাগাদ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি আজগুবি নোটিশ এসে গেল সেই সাংসদের কাছে। বলা হল, সার্কিট হাউসের এই অংশে মেরামতি হবে। তাই খালি করে দিতে হবে। রাত এগারোটায় একজন মহিলা সাংসদকে বলা হচ্ছে, ঘর খালি করে দিতে হবে। তখন নাকি মেরামতি হবে।
এদিকে, বাইরে সেই স্বঘোষিত দেশভক্তের দল ‘জয় শ্রীরাম’ বলে চিৎকার করেই চলেছেন। জিজ্ঞেস করুন, রামের মায়ের নাম কী, কজন বলতে পারবেন, যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এমন ভক্তকূলকে দেখলে রামচন্দ্র নিশ্চিতভাবেই প্রবল আহ্লাদিত হতেন!
রাত পোহালেই পনেরোই আগস্ট। তার আগের রাতে কৃষ্ণনগরের এই ছবিটাই বলে দিচ্ছে, প্রশাসন ঠিক কেমনভাবে চলছে।
মহুয়া মৈত্রর নামে যে যেখানে পারছেন, এফআইআর করে বসছেন। তাঁর কথায় নাকি ধর্মীয় ভাবাবেগ আহত হয়েছে। কেউ বলছেন, তাঁর কথায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। তাও সেই কথাগুলো কখনকার? কোনওটা হয়তো এক বছর আগের, কোনওটা তারও আগের। এত দেশভক্তির ছড়াছড়ি! সত্যিই, মেরা ভারত মহান।
এঁদের ধর্মীয় ভাবাবেগ, এঁদের দেশপ্রেম এতটাই ঠুনকো, যে যা বলেন, তাতেই নাকি তা ক্ষুন্ন হয়ে যায়। আসলে, দোষটা এই বীরপুঙ্গবদের নয়, তাঁরা যা দেখছেন, তাই শিখছেন।
কয়েকদিন আগেই মহুয়া গিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টে। তাঁর দাবি ছিল, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই তাঁর নামে একের পর এক মামলা হচ্ছে। তিনি গেলে তাঁকে হেনস্থা করা হচ্ছে। অতীতেও এমনটা হয়েছে। প্রশাসন কার্যত নীরব দর্শক থেকেছে।
বিচারপতিরা কী বললেন? তাঁরা বললেন, ইংরেজ আমলে বিপ্লবীরা বুলেটে সামনে বুক পেতে দিত। আর আপনি একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে ডিমকে ভয় পাচ্ছেন?
শুনতে খুব ভাল। আসলে, এইসব মন্তব্যগুলোই শিরোনাম হয়। সেখান থেকেই দুর্বৃত্তরা উৎসাহ পায়। বিচারপতিদের সম্পর্কে কেউ কেউ যেন অতিমাত্রায় শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠেন। ভাবখানা এমন, তাঁদের বিরুদ্ধে কিচ্ছু বলা যাবে না। তাঁরা যেন যাবতীয় প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। তাঁরাও কিন্তু মাঝে মাঝেই দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করেন। তাঁরা যদি নিজেদের চেয়ারে বসে ন্যূনতম আইনের রক্ষাটুকু করতেন, একের পর এক মামলা এভাবে প্রহসনে পরিণত হত না। সিবিআই, ইডি নামক দুটি চূড়ান্ত অপদার্থ এজেন্সি বছরের পর তদন্তের নামে এই ছেলেখেলা করতে পারত না।
যাক, মহুয়ার বিষয়ে ফিরি। রাতের বেলা সার্কিট হাউসের বাইরে যে বীরপুঙ্গবরা বিক্ষোভের নামে অসভ্যতা চালিয়ে গেলেন, তাঁরা জানতেন, যতই পাশে এসপি বা ডিএমের বাংলো হোক, তাঁরা কিছুই করতে পারবেন না। আসলে, কিছুই বদলায়নি। এসপি বা ডিএম অতি তৎপর হয়ে উঠতেন যদি শাসক দলের কোনও এমপি বা মন্ত্রীকে ঘিরে বিক্ষোভ হত। কিন্তু তাঁরাও জানেন, সর্বোচ্চ প্রশাসন তাঁদের নিষ্ক্রিয়তাই চাইছে। বরং কীভাবে মহুয়াকে সার্কিট হাউস থেকে বের করতে হবে, কীভাবে আরও হেনস্থা করা যায়, সেই হুকুম তামিল করা বেশি জরুরি। তাই রাত এগারোটায় এমন আজগুবি নোটিস ইস্যু করতেও তাঁদের আটকায় না।
আসলে, তাঁরাও জানেন, সুপ্রিম কোর্ট কিছুই করবে না। তাঁরাও জানেন, মহুয়া যতই লোকসভার স্পিকারকে চিঠি লিখুন, কার্যত কোনও পদক্ষেপই হবে না।
ওই বীরপুঙ্গবরা যে চিৎকার করে গেলেন, হেনস্থা তাহলে কার হল? মহুয়ার! একেবারেই না।
মহামান্য স্পিকার, মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট, আর কবে আপনাদের ঘুম ভাঙবে? এখনও যদি নিজেদের চেয়ারের মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন না হোন, আরও অনেক থাপ্পড় আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
