স্বরূপ গোস্বামী
সময়টা ঠিক পাঁচ বছর আগে। প্রায় সকলে ধরেই নিয়েছিলেন, রাজ্যে এবার বিজেপির সরকার হচ্ছে। অবকি বার দুশো পার, এমন স্লোগান শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে পাড়ার পল্টুদা, সবাই যেন একই সুরে কথা বলছিলেন। এমনকি তৃণমূল নেতৃত্বের চোখমুখও ছিল থমথমে। তাঁরাও বোধহয় ধরে নিয়েছিলেন, এবার সরকার উল্টে যাচ্ছে। বিভিন্ন এক্সিট পোলে এগিয়ে রাখা হচ্ছিল বিজেপিকেই। সেখানে ২০০ বেশি আসন হয়তো দেখানো হয়নি, কিন্তু সরকার যে হচ্ছে এমন ইঙ্গিত ছিল।
একমাত্র প্রশান্ত কিশোর। যিনি জোর গলায় বলেছিলেন, বিজেপি কোনওভাবেই তিন অঙ্কে পৌঁছতে পারবে না। যদি বিজেপি তিন অঙ্কে পৌঁছে যায়, তবে তিনি আর ভোট কুশলী থাকবেন না। এই পেশা থেকে স্বেচ্ছায় বিদায় নেবেন। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, প্রশান্ত কিশোর হয়তো গণনার আগে তৃণমূল কর্মীদের উজ্জীবিত করার জন্যই এমনটা বলেছিলেন। কিন্তু ভোটের ফল বেরোতেই দেখা গেল, বিজেপি সত্যিই দু অঙ্কেই আটকে গেল। সর্বসাকুল্যে আসন গিয়ে দাঁড়ালো ৭৭। এত বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা আসতে পারে, খোদ তৃণমূল নেতৃত্ব সম্ভবত ভাবতে পারেননি।
বামেরা যখন দীর্ঘদিন শাসন ক্ষমতায়, তখন মাঝে মাঝেই প্রশ্ন উঠতো, সিপিএম কি সত্যিই এতখানি গ্রহণযোগ্য? এক বিখ্যাত সাংবাদিক প্রায়ই বলতেন এবং লিখতেন, বামেরা যতখানি গ্রহণযোগ্য, তৃণমূল তার থেকে অনেক বেশি বর্জন যোগ্য। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের পরেও হয়তো এই প্রশ্নটাই প্রাসঙ্গিক ছিল। তৃণমূল যত না গ্রহণযোগ্য, তার থেকে অনেক বেশি বর্জনযোগ্য ছিল বিজেপি। কারণ নির্বাচনের আগে তারা শুধু হুংকারই দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভোটে জেতার জন্য যা যা উপাদান লাগে, তার অধিকাংশই তাদের সঙ্গে ছিল না। টাকার জোর হয়তো ছিল, কিন্তু নিচু তলায় সংগঠন বলে তেমন কিছুই ছিল না। প্রার্থী নির্বাচন ছিল একেবারেই ত্রুটিপূর্ণ। অর্ধেকের বেশি আসনে প্রার্থী করা হয়েছিল তৃণমূল থেকে আসা নেতাদের। স্থানীয় স্তরে যাদের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ, তারাই কিনা এসে প্রার্থী হয়ে গেলেন বিজেপির হয়ে। ফলে প্রত্যাখ্যানই ছিল তাদের ভবিতব্য।
কোনও সন্দেহ নেই, অতীতের ভুল থেকে বিজেপি অনেকটাই শিক্ষা নিয়েছে। তৃণমূলে টিকিট না পেয়ে যাঁদের দম বন্ধ হয়ে আসছিল, তাঁদের জন্য অন্তত রেড কার্পেট পাতা ছিল না। বরং দরজাটা বন্ধই ছিল। এটা যদি একটা ইতিবাচক দিক হয়ে থাকে, তবে সিবিআই ও ইডির ধারাবাহিক ব্যর্থতা ছিল মস্ত এক নেতিবাচক দিক। কয়লা, বালি, গরু, সারদা, নারদা, চাকরি দুর্নীতি, আরজিকর- এমন নানা বিষয়ে তদন্তের সরাসরি দায়িত্ব ছিল সিবিআই ও ইডির হাতে। মাথা পর্যন্ত পৌঁছানো তো দূরের কথা, এই দুই তদন্তকারী সংস্থা হাটু পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। সত্যিই কি তারা তদন্তের কিনারা করতে পারেনি? নাকি করতে চায়নি?
ভোটের আগে নতুন করে যোগ হল এস আই আর। এখানেও বিজেপি নেতৃত্ব শুরু থেকেই হুংকার ছাড়লেন, এক কোটি রোহিঙ্গার নাম নাকি ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে। এখানেও কার্যত পর্বতের মূষিক প্রসব। কিছু মৃত ভোটার, কিছু স্থানান্তরিত ভোটারের নাম বাদ গেল ঠিকই, কিন্তু তার জন্য যে হুংকার ছাড়া হয়েছিল, তা বুমেরাং হয়ে গেল। লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্স এর নামে ভোগান্তির চূড়ান্ত। সংখ্যালঘু নাম যেমন বাদ পড়ল, তেমনি বিরাট সংখ্যক হিন্দুর নামও বাদ গেল। বিজেপি নেতৃত্ব ভেবেছিলেন, বাকি সব ইসুকে দূরে সরিয়ে রেখে শুধু এস আই আর আর হিন্দু-মুসলিম করেই ভোটের বাজার গরম করবেন।
গ্রাম থেকে শহর, সর্বত্রই একটা হাওয়া উঠেছিল এটা ঘটনা। ভোটের বড় চালিকা শক্তিকে হাওয়া, এনিযেও তেমন সংশয় নেই। কিন্তু শুধু হাওয়া দিয়ে ভোটে জেতা যায় না। যা যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, তা কতখানি বিশ্বাসযোগ্য, সেটাও দেখা দরকার। যেমন প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করে বসলেন, ক্ষমতায় এলে সব মহিলাকে তিন হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী যা যা ঘোষণা করেছিলেন, তার কতটুকুই বা বাস্তবায়িত হয়েছে? প্রায় কুড়িটি রাজ্যে বিজেপির সরকার চলছে। কোন রাজ্যে মহিলাদের তিন হাজার করে ভাতা দেওয়া হয়? কেউ কেউ বিশ্বাস করেছেন ঠিকই, অনেকে বিশ্বাস করেননি এটাও ঘটনা।
তাহলে ভোটের ফল কী হবে? রাস্তায় বাসে মেট্রো বা অটোয় চড়লে মনে হবে এই সরকারের পতন শুধুই সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু বাস্তবের অঙ্ক একটু হলেও ভিন্নতর। তৃণমূলের আসল ভোট ব্যাঙ্ক সম্পর্কে আমাদের সম্যক ধারণাই নেই। বিগত নির্বাচনগুলিতে যাঁরা তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের কজনকে আমরা ঠিকঠাক চিনি? তাঁদের কজনের সঙ্গে আমরা উপযুক্ত সম্মান দিয়ে দুদন্ড গল্প করেছি? কখনও তাঁরা সংখ্যালঘু বলে উন্নাসিকতায় নাক সিটকেছি। কখনও আবার গ্রাম-গঞ্জের মহিলাদের ভিখারি বলে কটাক্ষ করেছি।
এবারও এক্সিট পোল যাই বলুক, বাস্তবের মাটির গন্ধ চিনতে হয়তো কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। টিভি চ্যানেল বা ফেসবুক দেখে আমরা যতই উল্লাসিত হই, যারা তৃণমূলকে অক্সিজেন দিয়ে টিকিয়ে রেখেছেন, তাঁরা এই ফেসবুকের বৃত্তের অনেক বাইরে। তাঁদের জীবনের স্পন্দন থেকে আমরাও অনেক দূরে।
