সরল বিশ্বাস
যিনি যে বৃত্তে বসবাস করেন, তিনি সেই বৃত্ত নিয়েই চিন্তিত। তাঁর বন্ধুমহল সেই বৃত্তের অন্তর্গত। যেমন বাম মহলে গত কয়েক মাস ধরে বারবার ঘোরাফেরা করেছে একটি প্রশ্ন, এবার কতগুলো আসন হবে? তবে প্রশ্নের ধরন গুলো একটু ভিন্ন। যাঁরা সংশয়ী, তাঁদের প্রশ্ন, এবার শূন্য কাটবে তো? আবার যাঁরা অতিরিক্ত আশাবাদী, তাঁরা তো পারলে সরকারই গড়ে দেন।
ঘুরেফিরে কয়েকটি নাম ভেসে উঠছে। অবশ্যই সামনের সারিতে মীনাক্ষী মুখার্জি। উঠে আসছে বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য, দীপ্সিতা ধর, কলতান দাশগুপ্ত, সায়নদীপ মিত্র দের কথা। জেলার প্রার্থীদের নাম সেভাবে উঠে আসছে না। বড়জোর কেন্দ্র হিসেবে কেউ কেউ ডোমকল বা করণদিঘির কথা বলছেন। ফেসবুকের বিভিন্ন বামমনস্ক গ্রুপে এমন এমন কেন্দ্রের নাম ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেগুলিতে জেতা তো দূরের কথা, এমনকি দ্বিতীয় হওযা অনেক দূরের কথা, অনেকটা পিছিয়ে তৃতীয় হওয়াই ভবিতব্য।
কলকাতা বা সংলগ্ন এলাকার প্রার্থীদের নিয়ে প্রচার একটু বেশি হবে সেটাই স্বাভাবিক।। কারণ, বাংলার মূল স্রোত মিডিয়া অনেকটাই কলকাতা কেন্দ্রিক। মিডিয়ার মাথায় যাঁরা বসে আছেন, তাঁরা কলকাতার চোখ দিয়ে এই গোটা বাংলাকে দেখতে চান।
কোনও সন্দেহ নেই এবারের নির্বাচনে বামেরা যে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে, যোগ্যতার নিরিখে এই প্রার্থীরা নিজের নিজের এলাকায় সবার থেকে এগিয়ে। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক, ভোটের বাইনারি অনেক আগেই নির্ধারিত হয়ে আছে। ২০১৯ থেকে শুরু হয়েছে এই বাইনারি। প্রায় সব কেন্দ্রেই লড়াই তৃণমূল বনাম বিজেপি, এই ছবিটাই তুলে ধরছে মূল স্রোত মিডিয়া। আপনি মানুন আর নাই মানুন, অধিকাংশ আসনে এই বাইনারিই হল নির্মম বাস্তবতা। সেই বাইনারির পেছনে রয়েছে ধর্মীয় মেরুকরণও। কাজের নিরিখে যদি তৃণমূল বনাম বিজেপির লড়াই হত, তাহলে তেমন প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু দুই শিবিরের লড়াইয়ে কাজের কথা, কর্মসংস্থানের কথা বা দুর্নীতির কথা একেবারেই উঠে আসছে না। ঘুরেফিরে সেই হিন্দু বনাম মুসলিম, এই আবহই টেনে আনা হচ্ছে। ভোটের বাইনারি যখন এমন নির্লজ্জ বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, সেখানে প্রগতিশীলদের লড়াইটা একটু কঠিন হয়ে যায়।
তাই সহজ কথাটা সহজে বলাই ভাল। আসন জয়ের নিরিখে এবারও তেমন সম্ভাবনা নেই। শূন্য দশা নিশ্চিতভাবেই কাটবে। কিন্তু বামেদের আসন কি পাঁচ অতিক্রম করবে? এমন সম্ভাবনা সত্যিই দেখা যাচ্ছে না। যে কটি আসন আসবে, তা হয়তো মালদা বা মুর্শিদাবাদ থেকেই। কলকাতা বা সংলগ্ন এলাকার প্রার্থীরা, যতই যোগ্য হোন, যতই তাদের নিয়ে ফেসবুক আন্দোলিত হোক, যতই তাদেরকে ঘিরে উজ্জ্বল স্বপ্ন দেখা হোক, জয়ের পথটা বড়ই কন্টকাকীর্ণ। কোনও সন্দেহ নেই যাদবপুরে বিকাশ ভট্টাচার্যই যোগ্যতম প্রার্থী। তাঁর একশো মাইলের মধ্যেও নেই তৃণমূল বা বিজেপির প্রার্থী। কিন্তু তারপরও তিনি জিতবেন, এমনটা জোর দিয়ে বলার উপায় নেই। ঠিক তেমনই, গ্রহণযোগ্যতার নিরিখে উত্তরপাড়ায় মীনাক্ষীর একশো মাইলের মধ্যে অন্যরা নেই। তারপরও যাঁরা ভোট দেবেন, তাঁরা সেই হিন্দু বনাম মুসলিম আবর্তে ঘুরপাক খাবেন।
মানুষ অভিজ্ঞতা থেকে শেখে। মানুষ ঠকে শেখে। কিন্তু বাঙালির চিন্তা চেতনার মান এমন স্তরে নেমে এসেছে, তাঁরা ভোটের বাক্সে বিরাট কিছু বিপ্লব এনে দেবেন, এমন আশা করাটা কিছুটা দুরাশারই শামিল। তাই আঙ্গুর ফল টকের মত শোনালেও, বলতেই হচ্ছে, এখনই বামেরা জিতবেন, বাঙালি এখনও এতোখানি পরিণত হয়নি। যে বাঙালি সারাক্ষণ হিন্দু বনাম মুসলিম তর্কে মেতে থাকে, তৃণমূল বা বিজেপিই তাঁদের ভবিতব্য। বামেদের শাসক হিসেবে পাওয়ার মতো যোগ্যতা বাঙালি এখনও অর্জন করেনি।
