৩৫–‌৩৬ পর্যন্ত খেলার দিন শেষ

সুগত রায়মজুমদার
‌শ্রীকৃষ্ণের যুগে কথিত ছিল রাজা কংসের বিরুদ্ধে, ‘‌তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে’‌। সেই প্রবাদবাক্য এবারের বিশ্বকাপ দেখতে দেখতে মনে পড়ছে। ইউরোপে প্রায় সব দেশেই প্রতি বছরই লিগ ফুটবল হয়। ইউরো কাপ হয়। সেখানে ইউরোপের সেরা দলগুলি খেলে। বার্সিলোনা, রিয়েল মাদ্রিদ, পিএসজি, বায়ার্ন মিউনিখ, ম্যাঞ্চেস্টার সিটি, ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড, রোমা, জুভেন্টাসের মতো দলগুলি খেলে। আমরাও সেই খেলা রাত জেগে দেখে সব তারকাদের গুণগান গাই। কখনও বলি মেসি সেরা, কখনও বলি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। আলোচনা করি, র‌্যামোসের মতো, পিকে–‌র মতো ডিফেন্ডার নেই সারা বিশ্বে। সেটাই ক্লাবে, রাস্তাঘাটে, ট্রেনে, বাসে আলোচনা করে আনন্দ পাই। যুগ যে পাল্টাতে শুরু করেছে সেটা আমরা এতদিন খেয়াল করিনি।

আমাদের মতো যাঁরা রোজ খেলা দেখেন বা খেলার খবর রাখেন, তাঁরা বোঝেন। আমাদের ধারণা যে ভুল নয়, সেটা প্রমাণ করেছে এবারের বিশ্বকাপ। সম্প্রতি আমি একটা লেখায় ৪ জুন এই কাগজে লিখেছিলাম, ব্রাজিল ছাড়া কাউকেই ফেবারিট ধরা উচিত নয়। কারণ একমাত্র ব্রাজিল দলেই তরুণ খেলোয়াড়ের সংখ্যা বেশি। সেটা ব্রাজিলের কোচ টিটে ও ইংল্যান্ডের কোচ সাউথগেট বুঝেছেন। ইংল্যান্ডে প্রচুর নামকরা ফুটবলার, যেমন লিনেকার, বেকহ্যাম, শিয়েরার, গ্যাসকোয়েনদের মতো খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপে খেলেছেন। ইংল্যান্ডের কাগজগুলি অনেকদিন আগে থেকেই বিরাট প্রচার করে তাঁদের চাপে ফেলে দিত। সেটাই সাউথগেট খুব নামকরা খেলোয়াড়দের দলে নেননি। এজন্যই মিডিয়াগুলি তেমন প্রচার করেনি। আমরা খেলাপ্রেমীরা বুঝতে পারছি, কী সুন্দর ফুটবলটাই না খেলছে ইংল্যান্ড। সেটা আমরা টের পেয়েছিলাম ওদের অনূর্ধ্ব–‌১৭ দলটা দেখেই। তিনি বুঝেছিলেন, ফুটবলটা তারুণ্যের খেলা। বয়স্কদের খেলা নয়।

germany2

সেটাই এই বিশ্বকাপে প্রমাণ হচ্ছে রোজ। নামী দেশগুলি কীভাবে নাজেহাল হচ্ছে ছোট দলগুলির কাছে। প্রবীণ খেলোয়াড়রা ধরা পড়ে যাচ্ছেন। একদিকে র‌্যামোস, পিকেরা, অন্যদিকে মেসি, রোনাল্ডোরা ধরা পড়ে যাচ্ছেন তরুণদের কাছে। এঁদের মধ্যে মেসি ও রোনাল্ডো সকলের মধ্যে কিছুটা আলাদা বলেই কিছুটা ছাপ রাখতে পারছেন। শুধু স্কিল দিয়ে মেসি এক–‌দুটি ম্যাচ বের করে নিতে পারেন, রোনাল্ডো গতি ও শক্তি দিয়ে কিছু ম্যাচ বের করতে পারেন, সব ম্যাচে পারবেন না। ছোট ছোট দলগুলি যেভাবে গোকুলে বাড়ছে, সেটা কেউই টের পাননি। মেসি, রোনাল্ডোর মতো খেলোয়াড়, যাঁরা ৫ বার ব্যালন ডি ও’‌র, ২ ও ৩ বার পর পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের দাবিদার, সেই রোনাল্ডোও ইরানের বিরুদ্ধে ধরা পড়ে গেলেন। চাপে পড়ে নিজের খেলাই ভুলে গেলেন। যেটা মেসির হয়েছে আইসল্যাডের বিরুদ্ধে। যাদের জনসংখ্যা ৩ লাখ ২০ হাজার। বছরের বেশিরভাগ সময় বরফে ঢাকা থাকে। ছোট দেশগুলির উত্থান এটা বিশ্ব ফুটবলে শুভ লক্ষণ।
এই ভাবনাটা পেকারদের মতো কিছু পুরনো কোচেরা বুঝতে পেরেছেন দীর্ঘদিন ভিডিও ক্লিপিং দেখে, নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে ছক করে, রীতিমতো গবেষণা করে বের করেছেন, কী করে বড় বড় খেলোয়াড়দের আটকে দিয়ে গতি ও স্কিলের সংিমশ্রণে পাল্টা আঘাত করে নার্ভাস করে দিতে হয়। জার্মান লড়াকু বলে তারা কিছুটা বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে তরুণদের সুযোগ দিয়ে। নামী খেলোয়াড়দের বাদ দিয়ে। তাতেই সুফল পেয়েছে জার্মানি। আর্জেন্টিনাও এর সুফল পেয়েছে সেই ছক অনুসরণ করে। কিছু তরুণ ফুটবলার নিয়ে, বয়স্কদের বাদ দিয়ে। এই কোচেরা বুঝেছেন, ফুটবলটা তরুণদের জন্য, বয়স্কদের জন্য নয়। এবারের বিশ্বকাপের পর আপনারা লক্ষ্য করবেন, সব নামকরা দেশেরই কত খেলোয়াড় অবসর নিচ্ছেন আন্তর্জাতিক খেলা থেকে। আর্জেন্টিনা, জার্মান, স্পেন, পর্তুগালকে দেখে এটাই উপলব্ধ হচ্ছি। এবার দেখব, নতুন দেশ সার্বিয়া, মরক্কো, ইরান, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড, নাইজেরিয়া, ডেনমার্ক, জাপান, আইসল্যান্ডের মতো দেশগুলির উত্থান কতটা চমক দিতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সবশেষে বলি, এই যুগটাই আসছে, ৩৫, ৩৬ বছর বয়স পর্যন্ত ইউরোপের ক্লাবগুলিতে খেলে প্রচুর টাকা কামানোর দিন শেষ হয়ে আসছে। তরুণরা সেই জায়গা কেড়ে নেবে নিজস্ব যোগ্যতায়। তরুণরা বলবে, এবার আমাদের জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে বিশ্রাম নাও। সুতরাং সেই প্রবাদবাক্য সত্য হতে চলেছে আগামীদিনে।
‌‌

Previous post মহাজোট নিয়ে আলোচনা করার ডালুবাবু কে?‌
Next post ‌বঙ্কিম নিয়ে অমিত শাহ–‌র এত দরদ!‌

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *