বুঝতে হবে মমতা ব্যানার্জি যে সব দলের বিরুদ্ধে এহেন আচরণ করছেন, তারা তিনটি দলই কিন্তু জাতীয় দল। পরবর্তীকালে এই দলগুলি অনেক সংগঠিতভাবেই তৃণমূলকে গ্রহের বাইরে ছুঁড়ে ফেলতেও দ্বিধা করবে না। এটাই হবে তৃণমূলের ভবিতব্য। জোট দলের হয় না। জোট হয় নিপীড়িত মানুষের।লিখেছেন সুগত রায়মজুমদার।।
বিগত ৩০ বছরের বেশি ধরে যে নেত্রী মমতা ব্যানার্জি দোর্দণ্ডপ্রতাপ জগদ্দল পাথর সিপিএমের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য লড়াই ও আন্দোলন করে পশ্চিমবঙ্গবাসীর মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন, তাঁর জন্য অনেকেই গর্ব অনুভব করতেন। তিনিই নাকি (এখন বলতে হয় ক্ষমতার অহঙ্কারে) চরম স্বৈরতন্ত্রী হয়ে উঠলেন। তিনি কি বিস্মৃত হলেন সেই সব দিনগুলির কথা? যে সব দিন তিনি কোনও দলের মদত ছাড়াই একাই লড়াই করে সিপিএম দল থেকে মানু্যকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন! মনোনয়ন ঘিরে তাঁর এই রূপ মানুষ দেখতে চাননি কোনও দিন। তাঁর সাহসিকতা সারা ভারতবাসীকে মুগ্ধ করেছিল। আজ তিনি এটা কী করছেন?
বর্তমানে মমতা ব্যানার্জির শাসনকালে বাংলায় পঞ্চায়েত ভোটে মনোনয়ন নিয়ে যে সন্ত্রাস চলছে, তাতে আমরা সেই অতীতের মমতাকে মেলাতে পারছি না। মনোনয়ন পেশ নিয়ে যা চলছে রাজ্যে, তা অভূতপূর্ব। সাধারণ মানুষ মিডিয়ার মাধ্যমে সব জানছেন, দেখছেন। সিপিএমও ভাবত আমরা অপ্রতিরোধ্য। মমতার তৃণমূলও ভাবছে তাই। রাজনীতিতে কেউ অপরিহার্য নয়। ক্ষমতার অহঙ্কারই মানুষকে পরিবর্তিত করে। সাধারণ মানুষ যেমন কোনও দলকে নিয়ে মাতামাতি করেন, তেমনি ছুঁড়ে ফেলতেও সময় নেন না। মমতার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকেই বোঝা উচিত ছিল। আজ তিনি গদি চলে যাওয়ার ভয়ে বিজেপি–কে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে রাজ্যে অযথা গায়ে পড়ে খুঁচিয়ে বিকল্প করে দ্বিতীয় স্থানে এনে ফেলেছেন। সিপিএম, কংগ্রেস এখন এ রাজ্যে মানুষের কাছে ব্রাত্য। তাদের কোনও অস্তিত্ব নেই। এটাও তাদের নিজেদের জন্য। এই দুই দলের কর্মীদের মানুষের কাছে কোনও গুরুত্ব নেই। সেজন্য তারা ভাবছে, বিজেপি–কে মদত দিলে তৃণমূলকে তাড়াতে পারব। তৃণমূলই তাদের মূল শত্রু।

মমতা ব্যানার্জি ভাবেন, সিপিএম ও কংগ্রেসেরও প্রধান শত্রু বিজেপি। এটা আদৌ খাটে না এ রাজ্যে। এই ভাবনা দুই দল বিজেপি–কে কেন্দ্রে প্রধান শত্রু ভাবেন। গত বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস–সিপিএম একই মঞ্চে এসেছিল রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি ভেবে। এখনও ওই দুই দল তাই ভাবে। এজন্য সম্প্রতি সিপিএম দল পার্টি কংগ্রেসে কারাটকে না মেনে রাজ্যে একই অবস্থান নিতে চায়। এই নীতি সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিরও মত। রাজ্যেও বেশিরভাগ সিপিএম সমর্থকের মত। তাঁরা তৃণমূল সরকারের পতন চান। এজন্য যা করতে হয় করবেন। এই দুই দলের প্রধান শত্রু এ রাজ্যে তৃণমূল। বিজেপি নয়। কংগ্রেসের অধীর চৌধুরিও কেন্দ্রীয় নীতি না মেনে রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।
সন্ত্রাস যেভাবে গ্রাস করছে তৃণমূলকে, তা দেখে সাধারণ মানুষও আতঙ্কিত। মনোনয়ন পেশ নিয়েই এই অবস্থা, তা হলে নিবাচনে কী ঘটতে চলেছে তা অনুমান করে ফেলেছেন সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষ চান সবসময় বিকল্প। সবাইকেই একবার সুযোগ দিয়ে দেখি। সেটা পরবর্তীকালে বিজেপি–কেও দিতেই পারেন।
পরিবর্তনের ছায়া সর্বদাই প্রথম পড়ে বিদ্বজ্জনদের মধ্যে। মমতা ব্যানার্জি এখনও বুঝতে পারছেন না, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামে তাঁর সাহসী আন্দোলনের সময় যাঁরা তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে সমর্থন দিয়েছেন, তাঁদের গরিষ্ঠাংশই আজ তাঁর ওপর বিরক্ত। তাঁরা কেউ মমতাকে স্বৈরাচারী হিসেবে দেখতে চাননি। তাঁরা কেউ বিজেপি–কে পছন্দ করেন না। কারণ বিজেপি পুরোপুরি ফ্যাসিবাদী দল। বিদ্বজ্জনরা মমতাকে আশ্রয়স্থল ভেবেছিলেন। এখন তাঁরা মমতার এই রূপে বিস্মিত। তাঁরা মমতাকে নিজেদের মানুষ হিসেবেই মেনেছিলেন। এখন তাঁরা হতাশ।

সিপিএম শাসনকালে সিপিএম–ও মনোনয়ন নিয়ে এতটা বাড়াবাড়ি করেনি। তারা প্রার্থীদের বাড়ি বাড়ি থান ফেলে দিত। এরকম গুলিগোলা বোমবাজি, খুন হত না। যা হত নির্বাচনের দিন। সেজন্যই সিপিএমকে মানুষ সমু্দ্রে ছুঁড়ে ফেলেছেন। তৃমমূল মনোনয়ন পেশ থেকেই শুরু করেছে। নির্বাচনের দিন কত মানুষ প্রাণ হারাবেন সেটা ভবিষ্যতই বলবে। এই বছর পঞ্চায়েত ভোটের মনোনয়ন পেশ করা নিয়ে তাঁর দল রাজ্যে ও দেশে যে ধারণা তৈরি করলেন, তা এই পঞ্চায়েত ভোটেই কিছুটা টের পাবেন।
সাধারণ মানুষ যাঁকে গণতন্ত্রের পুজারি মনে করতেন, তাঁর কোনওরকম বাধার পরিবর্তে দলকে সমর্থন দেওয়া এটা কেউ মেনে নিতে পারছেন না। তাতে গায়ের জোরে এবার হয়তো পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষকে প্রার্থী হতে না দিয়ে কোনওরকমে উতরে যেতে পারেন, এটা পরবর্তীকালে আর হতে দেবেন না সাধারণ মানুষ। এর জবাব সামনের লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে পেতেই হবে। অতীত তাই বলে।
বুঝতে হবে মমতা ব্যানার্জি যে সব দলের বিরুদ্ধে এহেন আচরণ করছেন, তারা তিনটি দলই কিন্তু জাতীয় দল। পরবর্তীকালে এই দলগুলি অনেক সংগঠিতভাবেই তৃণমূলকে গ্রহের বাইরে ছুঁড়ে ফেলতেও দ্বিধা করবে না। এটাই হবে তৃণমূলের ভবিতব্য। জোট দলের হয় না। জোট হয় নিপীড়িত মানুষের।
