দলবদলুরা জানেন, শুধু তাঁরা একাই চরিত্রহীন নন

রক্তিম মিত্র

শরৎচন্দ্রের একটি জনপ্রিয় উপন্যাস আছে— চরিত্রহীন। তার আগে থেকেই শব্দটার প্রচলন ছিল। কিন্তু এই উপন্যাসের পর থেকে এই শব্দটা বাঙালি আখছার ব্যবহার করে। সাধারণভাবে চরিত্রহীন মানে কী?‌ এক পুরুষ যদি একাধিক নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হন, তাঁকেই আমরা চরিত্রহীন বলে থাকি। উল্টোটাও সত্যি, কোনও নারী যদি একাধিক পুরুষের সঙ্গে লিপ্ত থাকেন, তাঁকেও এই নামেই আখ্যায়িত করা হয়।

মোদ্দা কথা, যাঁর চরিত্র নেই, তিনিই চরিত্রহীন। কিন্তু কেন জানি না, বিষয়টার মধ্যে নারী–‌পুরুষের অনুষঙ্গ এনে ফেলা হয়। ধরা যাক, একজন একটি দলের হয়ে ভোটে জিতলেন। তারপর কয়েক মাস বা বছর যেতে না যেতেই শাসক দলে নাম লিখিয়ে ফেললেন, তাঁকে আমরা কী বলব?‌ সেই দলবদলুকে কি চরিত্রকহীন বলা যায়?‌

রাজনীতিতে দলবদল নতুন কোনও বিষয় নয়। এক দল ছেড়ে অন্য দলে যাওয়ার রেওয়াজ অনেক দিনের। নানা কারণে পুরনো দলের সঙ্গে মতের অমিল হতে পারে। বিশেষ কোনও ইস্যু নিয়ে মতপার্থক্যও হতে পারে। কেউ অভিমানে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। কেউ দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর অন্য দলে যোগ দেন। যাঁর জনভিত্তির প্রতি আস্থা আছে, তিনি নিজেও নতুন দল খোলেন।

আপাতত দুটি উদাহরণ দেওয়া যাক। মমতা ব্যানার্জি ও শুভেন্দু অধিকারী। মমতার মনে হয়েছিল, কংগ্রেসে থেকে তিনি লড়াই করতে পারছেন না। দিল্লির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সমর্থন পাচ্ছেন না। তিনি নতুন দল খোলেন। শুভেন্দু অধিকারীর মনে হয়েছিল, তৃণমূলে থেকে তিনি কাজ করতে পারছেন না। শিবির বদল করা দরকার। সব পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে নতুন দলে নাম লেখান।

এই দুই দল বদলের মধ্যে অন্তত কিছুটা হলেও নৈতিকতা আছে। কিন্তু যাঁরা এক দলের টিকিটে নির্বাচিত হয়ে অন্য দলে চলে যাচ্ছেন, তাঁদের দলবদলের সঙ্গে আদর্শ বা নৈতিকতার কোনও সম্পর্ক নেই। যদি মনে হয়, অন্য দলে যেতে চান, তাহলে পদত্যাগ করে যান। এক দলের টিকিটে বিধায়ক, অথচ অন্য দলের মিছিলে হাঁটবেন, এ কেমন নৈতিকতা?‌

অর্থনীতির চালু কথা, চাহিদা থাকলে তবেই যোগান থাকে। রামবাবুর মনে হতেই পারে, শাসক দলে যোগ দিলে ভাল হয়। কিন্তু শাসক দলের তো কিছু নৈতিকতা থাকবে। তারা কেন বলবে না, আসতে হলে পদত্যাগ করে আসুন। দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের বাম জমানায় অনেক অভিযোগ থাকতে পারে। কিন্তু অন্য দল থেকে জনপ্রতিনিধিদের ভাঙিয়ে আনার অভিযোগ অন্তত ছিল না। একের পর এক পুরসভা বছরের পর বছর হয় কংগ্রেস নয় তৃণমূলের দখলে ছিল। সিপিএম চাইলে অন্য দল থেকে কয়েকজনকে ভাঙিয়ে এনে পুরসভার দখল নিতেই পারত। কিন্তু অন্তত এই জায়গায় সংযম দেখিয়েছে। অন্য দল থেকে বিধায়ক বা সাংসদ নেওয়ার তো কোনও প্রশ্নই নেই।

কিন্তু এই রাজ্যে তৃণমূল বা বিজেপির এই নৈতিকতার কোনও বালাই নেই। এক দল থেকে আসা বিধায়ক বা সাংসদকে অন্য দল কী অবলীলায় বরণ করে নেয়!‌ তিনি এখনও অন্য দলের টিকিটে বিধায়ক বা সাংসদ। অথচ, দলে নেওয়ার আগে এটুকুও বলার সাহস হয় না যে, পদত্যাগ করে আসুন। সম্প্রতি আরও এক বিধায়ক বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে এলেন। আরও কয়েকজন আসার অপেক্ষায়। শুধু তাঁদের ধিক্কার দিয়ে লাভ নেই। ধিক্কার দিতে হলে, যাঁরা নিচ্ছেন, তাঁদের দেওয়া দরকার। ধিক্কার দিতে হলে স্পিকারকেও দেওয়া দরকার। কারণ, গত চোদ্দ বছরে অন্তত পঞ্চাশজন বিধায়ক শাসক দলের যোগ দিয়েছেন। একটি ক্ষেত্রেও তিনি কোনও ব্যবস্থা নিতে পারেননি। স্পিকারের পদকে কলঙ্কিত করেছেন। তাই দলবদলুরা জানেন, তাঁদের কিছুই হবে না।

তাই এই সব দলবদলুকে কেন চরিত্রহীন বলা যাবে না?‌ যাঁরা তাঁদের বরণ করে নিচ্ছেন, তাঁদেরই বা কেন চরিত্রহীন বলা যাবে না?‌ সে স্পিকার সবকিছু দেখেও, বারবার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও টালবাহানা করেন, তাঁকেই বা কেন চরিত্রহীন বলা যাবে না?‌

Previous post কয়েক ঘণ্টা, সেই লামাদের মাঝে
Next post একজনকে বাঁচাতে ২৬ হাজার শিক্ষককে বলি!‌

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *