বিপ্লব মিশ্র
সত্যজিৎ রায় যদি ‘পথের পাঁচালী’ থেকে ছবি না বানাতেন, তাহলে কি সাহিত্যিক হিসেবে বিভূতিভূষণ এতখানি প্রতিষ্ঠা পেতেন? প্রশ্নটা উল্টোভাবেও করা যায়। বিভূতিভূষণ যদি এই কালজয়ী উপন্যাস না লিখতেন, বা সত্যজিৎ রায় যদি অন্য কোনও গল্প নিয়ে যাত্রা শুরু করতেন, তিনি কি এই খ্যাতি পেতেন? এ অনেকটা ডিম আগে না মুরগি আগের মতোই প্রশ্ন।
কার জন্য কে বিখ্যাত, সেই বিতর্ক বরং মুলতুবি থাক। তার থেকে সাহিত্য আর সিনেমা হাতে হাত রেখে চললে উভয়েরই মঙ্গল, এই সহজ সত্যিকে মেনে নেওয়াই ভাল। সদ্যপ্রয়াত সাহিত্যিক শংকরের কথাই ধরা যাক। শঙ্কর বললেই সবার আগে মনে পড়ে ‘চৌরঙ্গী’র কথা। বইটির বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। কতগুলি সংস্করণ হয়েছে, তা চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতোই। এখানেও সেই প্রশ্ন অনিবার্য, এটি যদি সিনেমা না হত, স্যাটা বোসের চরিত্র উত্তম কুমার যদি এমন প্রাণবন্ত অভিনয় না করতেন, তাহলে কি উপন্যাসটি এত জনপ্রিয় হত?
চৌরঙ্গী তাঁর একেবারেই প্রথম দিকের লেখা। ছয়ের দশকের উপন্যাস। ধারাবাহিকভাবে দেশ পত্রিকায় বেরিয়েছিল। ছয়ের দশকেই তাকে নিয়ে ছবি করেন পিনাকী ভূষণ মুখোপাধ্যায়। কলকাতার একটি পাঁচতারা হোটেলের পটভূমিতে মানুষের সম্পর্ক, উচ্চবিত্ত সমাজের ভেতরের দ্বন্দ্ব এবং একাকিত্বের গল্পকে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পর্দায় তুলে ধরেন। পরবর্তীকালে এই একই উপন্যাস থেকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে তৈরি হয় শাহজাহান রিজেন্সি, যার পরিচালক সৃজিত মুখার্জি। এই ছবিতে আধুনিক সময়ের প্রেক্ষাপটে উপন্যাসটির ভাবনাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শংকর (মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়)–এর উপন্যাস থেকে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বাংলা সিনেমা নির্মিত হয়েছে। শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন, কর্পোরেট সংস্কৃতি, চাকরির সংকট এবং মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব—এই বিষয়গুলো তাঁর লেখাকে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ফলে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গড়ে উঠেছে তাঁর রচনাকে কেন্দ্র করে।
শংকরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস কোম্পানি লিমিটেড অবলম্বনে তৈরি হয় সীমাবদ্ধ। এই ছবির পরিচালক ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। কর্পোরেট জগতে একজন সফল মানুষের নৈতিক সংকট এবং সামাজিক অবস্থানের প্রশ্নকে রায় অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। একইভাবে শংকরের আরেকটি উপন্যাস জন অরণ্য থেকে তৈরি হয় জন অরণ্য, এটিও পরিচালনা করেন সত্যজিৎ রায়। এই ছবিতে শিক্ষিত বেকার যুবকের সংগ্রাম এবং শহুরে সমাজের কঠিন বাস্তবতা অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে উঠে আসে।
সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে শংকরের উপন্যাসগুলোর একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাঁর লেখার ভাষা সহজ হলেও বিষয়বস্তু গভীর এবং অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। বিশেষ করে কলকাতাকেন্দ্রিক জীবন, চাকরির চাপ, সামাজিক বৈষম্য এবং মানুষের মানসিক দ্বন্দ্ব—এই বিষয়গুলো চলচ্চিত্রের জন্য খুবই উপযুক্ত উপাদান হয়ে ওঠে। ফলে পরিচালকরা তাঁর লেখাকে শুধু গল্প হিসেবে নয়, বরং সময়ের দলিল হিসেবেও ব্যবহার করেছেন।
বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়ের মতো একজন বিশ্বমানের পরিচালক যখন শংকরের উপন্যাস নিয়ে কাজ করেন, তখন সাহিত্য ও সিনেমার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তিনি শুধু গল্পকে পর্দায় তুলে ধরেননি, বরং চরিত্রগুলোর মানসিক জটিলতাকে দৃশ্যের মাধ্যমে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যদিকে পিনাকী ভূষণ মুখোপাধ্যায় বা সৃজিত মুখার্জির মতো পরিচালকরা একই সাহিত্যকেই ভিন্ন সময় ও ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন। এর ফলে বোঝা যায়, একটি শক্তিশালী সাহিত্যকর্ম সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ব্যাখ্যা পেতে পারে।
সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের এই ধারাটি বাংলা সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শংকরের উপন্যাসগুলো তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর লেখার ভেতরে যে বাস্তবতা, সামাজিক পর্যবেক্ষণ এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব রয়েছে, তা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বারবার অনুপ্রাণিত করেছে। ফলে বলা যায়, শংকরের সাহিত্য শুধু পাঠকের মন জয় করেনি, বাংলা সিনেমার ইতিহাসেও এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা তৈরি করে নিয়েছে।
