টি২০ বিশ্বকাপ:‌ ক্রিকেট বিশ্বায়নের পথে একধাপ

স্বরূপ গোস্বামী

ক্রিকেট আর ফুটবলের তুলনা টানতে গিয়ে একটি ছড়া খুব চালু আছে।

‘‌পৃথিবীর চারভাগে তিনভাগ জল
ক্রিকেট তুচ্ছ খেলা, খেলা ফুটবল।’‌

ছড়াটা অনেক আগের লেখা। তখন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার নিরিখে ফুটবলের তুলনায় ক্রিকেট সত্যিই অনেক পিছিয়ে ছিল।‌ কোনও সন্দেহ নেই, ফুটবল এখনও অনেকটাই এগিয়ে। কিন্তু বিশ্বায়নের পথে ক্রিকেটও খুব দ্রুত গতিতেই এগিয়ে চলেছে। এবারের টি২০ বিশ্বকাপ যেন সেটাই আরও একবার বুঝিয়ে দিল।

পরপর দু’‌বার বিশ্বজয়ী ভারত। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী মেতে আছে উল্লাসে। টি২০ ঘরানায় একসঙ্গে তিনটি বিরল নজির। প্রথমত, এই প্রথম কোনও দেশ তিনবার বিশ্বজয়ী হল। দ্বিতীয়ত, এই প্রথম পরপর দু’‌বার কোনও দল বিশ্বজয়ের স্বাদ পেল। তৃতীয়ত, এই প্রথম কোনও দেশ নিজের দেশের মাটিতে চ্যাম্পিয়ন হল। টিম ইন্ডিয়ার এই দুরন্ত উত্থান নিয়ে দিকে দিকে চর্চা তো চলছেই। কিন্তু এই সাফল্যের উল্লাসে অনেক বিষয় হয়তো ততখানি আলোকিত হচ্ছে না। তেমনই একটি বিষয় হল, ক্রিকেটের গ্লোবালাইজেশন, অর্থাৎ ক্রিকেটের বিশ্বায়ন।

১৯৮৩ বিশ্বকাপ জয় ভারতের ক্রিকেটে একটি মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতোই ঘটনা। ক্রিকেটকে ঘিরে উন্মাদনা যেন নতুন এক মাত্রা পেয়েছিল। চার বছর পরের বিশ্বকাপে, অর্থাৎ ১৯৮৭ তে ভারত আর পাকিস্তান ছিল আয়োজক। সেবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল আটটি দেশ। এবার টি২০ বিশ্বকাপে খেলল ২০টি দেশ। এর থেকেই বোঝা যায়, ক্রিকেটের বিস্তার কোন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে। কোনও দলই হেলাফেলা করার মতো দল নয়। আবির্ভাবেই চমক দিল ইতালি। যে ইতালিকে আমরা চিনি মূলত ফুটবলের জন্য। পরপর দু’‌বার তারা ফুটবল বিশ্বকাপের মানচিত্রেই নেই। অথচ, ক্রিকেটে আবির্ভাবেই সাড়া ফেলে দিল। ক্রিকেটে বহুচর্চিত দলগুলির বাইরে এবার অংশ নিয়েছিল আমেরিকা, নেদারল্যান্ডস, নামিবিয়া, আয়ারল্যান্ড, ওমান, নেপাল, ইতালি, স্কটল্যান্ড, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী। এইসব দেশ যে বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলবে, কয়েক বছর আগেও কি ভাবা গিয়েছিল?‌ সব দেশই কিছু না কিছু চমক দেখিয়েছে। আগামী দিনে বড় শক্তি হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিয়েছে।

জিম্বাবোয়ে। দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বকাপের আঙিনায় ছিল। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক, মূলস্রোত থেকে কিছুটা যেন হারিয়ে গিয়েছিল। এবার তারাও অস্ট্রেলিয়ার মতো দলকে গ্রুপ লিগ থেকে ছিটকে দিয়ে সুপার এইটে উঠে এল। আড়াই বছর আগে ভারতের মাটিতে হয়েছিল ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ। দু’‌বারের বিশ্বজয়ী ওয়েস্ট ইন্ডিজ যোগ্যতা অর্জন করতেই পারেনি। এবার তারাও সুপার এইট পর্যন্ত দুরন্ত লড়াই উপহার দিয়ে গেল।

ক্রিকেটের আঙিনায় এতদিন অন্ধকারে পড়ে থাকা এই সব দল কীভাবে উঠে এল?‌ কিছুটা কৃতিত্ব অবশ্যই আইসিসি–‌র। ক্রিকেটকে আর নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের ভূখণ্ডে আটকে রাখলে হবে না, তাকে বিশ্বের নানা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে, এই ভাবনা নিয়ে কাজ করে চলেছে আইসিসি। তারই বড় এক পদক্ষেপ হল লস এঞ্জেলেস অলিম্পিকে ক্রিকেটের অন্তর্ভূক্তি। ছেলেদের ক্রিকেট এবং মেয়েদের ক্রিকেট— দুই ঘরানার ক্রিকেটই জায়গা পেয়েছে অলিম্পিকে। সেখানেও খেলবে কুড়িটি করে দেশ। ক্রিকেটের মুকুটে ‘‌অলিম্পিক গেমস’‌ এর পালক ক্রিকেটকে আরও এগিয়ে দেবে। বিভিন্ন দেশ এখন থেকেই নিঃশব্দে প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। অলিম্পিকের আঙিনায় হয়তো বড় কোনও চমক অপেক্ষা করছে।

শুধু কি ছেলেদের ক্রিকেট!‌ মেয়েদের ক্রিকেটের জনপ্রিয়তাও ক্রমশ বাড়ছে। কয়েক বছর আগেও যেসব দেশে পুরুষ ক্রিকেট দলই ছিল না, সেইসব দেশে এখন মহিলা ক্রিকেট দলও তৈরি হয়ে গেছে। এটা বিরাট একটা সাফল্য। মেয়েদের ক্রিকেটে স্পনসর আসছে, পারিশ্রমিক বেড়েছে, টিভিতে নিয়মিত সম্প্রচার হচ্ছে। এমনকী ফ্র‌্যাঞ্চাইজি লিগও চালু হয়েছে। আইসিসি–‌র পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হত না। কয়েকদিন আগেই হয়ে গেল অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ। অনেক বছর ধরেই চলছে। কিন্তু এবার তা যেন পৌঁছেছিল অন্য এক উচ্চতায়। বোঝা গেল, বিভিন্ন দেশের সাপ্লাই লাইন তৈরি। আগামী দিনের ক্রিকেটকে কারা শাসন করবেন, সেই রূপরেখাও যেন তৈরি।

ক্রিকেটের গায়ে এমনিতেই লেগে আছে অনিশ্চয়তার তকমা। এত এত দল উঠে আসায় সেই অনিশ্চয়তা আর রহস্য যে আরও বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। ভারতে আইপিএল দিয়ে শুরু হয়েছিল ক্রিকেটের জমজমাট ফ্র‌্যাঞ্চাইজি লিগ। এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন দেশে। এমনকী, মধ্যপ্রাচ্য ও মার্কিন মুলুকেও ফ্র‌্যাঞ্চাইজি লিগ চলছে রমরমিয়ে। বিভিন্ন দেশের তারকা ক্রিকেটাররা অংশ নিচ্ছেন সেইসব লিগে। খুব দ্রুত চীন, জাপানের মতো দেশও বিশ্বকাপের আঙিনায় উঠে এলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

একটা সময় বলা হত, ক্রিকেট হাতে গোনা কয়েকটি দেশের খেলা। সেই মিথ ভেঙে গেছে। আমাদের দেশেও বলা হত, ক্রিকেট মূলত শহুরে খেলা। বড় বড় শহর থেকেই ক্রিকেটাররা উঠে আসতেন। সেই মিথও ভেঙে দিয়েছে আইপিএল। জেলা শহর, মফস্বল শহর, এমনকী প্রত্যন্ত গ্রাম থেকেও থেকে এত এত ক্রিকেটার উঠে এসেছেন, সংখ্যাটা তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো।

এবারের রনজি ট্রফির কথাই ভাবুন। কেউ সুদূরতম কল্পনাতেও ভাবতে পেরেছিলেন জম্মু ও কাশ্মীর রনজি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হতে পারে!‌ যাদের ক্রিকেটের পর্যাপ্ত পরিকাঠামো ছিল না। প্র‌্যাকটিস করার মাঠও ছিল না। তারাই কিনা সবাইকে চমকে দিয়ে রনজি চ্যাম্পিয়ন!‌ সেমিফাইনালে হারাল বাংলাকে, ফাইনালে হারাল কর্ণাটককে। রনজি ট্রফির ইতিহাসে অন্যতম সেরা চমক।

দেশে ও বিদেশে এভাবেই উঠে আসছে নানা শক্তি। আমরা যাদের বেড়ে ওঠার খবরও রাখি না। এবারের বিশ্বকাপ প্রদীপের তলায় জমে থাকা সেই অন্ধকারে কিছুটা আলো দেখাল। এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেটকে বিশ্বায়নের পথে আরও একধাপ এগিয়ে দিল।

Previous post সিরিয়াল চলে?‌ এরপরেও শান্তি আছে!‌
Next post বাবা–‌মা বই না পড়লে ছেলেও পড়বে না ‌

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *