শুনতেন বেশি, বলতেন কম

শুনতেন বেশি, বলতেন কম। এই গুণটি খুব কম রাজনীতিকের মধ্যেই দেখা যায়। মন দিয়ে অন্যের কথা শোনাটা যে জরুরি, এটা রাজনীতির প্রাথমিক একটা পাঠ। কিন্তু অনেকেই এই প্রাথমিক পাঠ ছাড়াই নেতা হয়ে যান। তাঁদের শোনার ধৈর্য কই?‌

সোনার কেল্লা পার্ট টু

(‌ঠিক বছর দশ আগের কথা। মুকুল রায়কে নিয়ে তৈরি হয়েছিল অদ্ভুত এক জল্পনা। তিনি আসলে কোন দলে, তাই নিয়েই ছিল নানা ধোঁয়াশা। মনে হচ্ছিল, তিনি যেন সোনার কেল্লার সেই মুকুল। পূর্বজন্মের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। বেঙ্গল টাইমসে লেখা হয়েছিল সোনার কেল্লা পার্ট টু। লিখেছিলেন রবি কর। সেই লেখা আবার প্রকাশিত হল।)‌

মিলিয়ে নেবেন, ইডি এবারও ‘‌কাঁচকলা’‌ করবে

যাঁরা ইডি, সিবিআই–‌কে চালান, তাঁরা এই দুই প্রতিষ্ঠানকে এতটাই ঘৃণার জায়গায় নামিয়ে এনেছেন। এবারও মিলিয়ে নেবেন, ইডি কাঁচকলাই করবে। মমতা ব্যানার্জি এসে ইডির কাছ থেকে শুধু ফাইল কেড়ে নিয়ে যাননি। তিনি ইডিকে কার্যত ধর্ষণ করে গেছেন।

সবাই হাওয়া গরম করতেই ব্যস্ত, ভোগান্তি তো বাড়বেই

ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা তৈরি হোক, এ নিয়ে কোনও মহলেই দ্বিমত থাকার কথা নয়। কিন্তু তা করতে গিয়ে যে পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে, তা বেশ বিভ্রান্তিকর। এতবড় একটা কাজ আরও সময় নিয়ে, আরও প্রস্তুতি নিয়ে করা যেত। কী কী সমস্যা আসতে পারে, এলে কীভাবে তা সামাল দেওয়া যায়, সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা ছিল বলেও মনে হয় না।

জ্যোতিবাবুর দলের লোকেরা যদি তাঁর মতো একটু সহজ ভাষায় বলতে পারতেন!‌

হ্যাঁ, এই ছিল ভাষণের নির্যাস। বাকিরা ইংরাজিতে বললেও জ্যোতিবাবু সেদিন পরিষ্কার বাংলাতেই বলেছিলেন। বাকিরা চায়ের জগতের দিকপাল। চা সম্পর্কে তাঁদের বিস্তর জ্ঞান উগরে দিচ্ছিলেন। জ্যোতিবাবুও চাইলে সেক্রেটারিকে দিয়ে চা নিয়ে একটা জ্ঞানগর্ভ ভাষণ তৈরি করে আনতে পারতেন। চায়ের বাণিজ্য, চা শিল্পের সম্ভাবনা, সঙ্কট, সরকারি পরিকল্পনা–‌এসব নিয়ে নিজের ঢাক পেটাতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেই রাস্তাতেই গেলেন না। একেবারে সহজ–‌সরল, সাদামাটা ভাষায় নিজের অনুভূতি তুলে ধরলেন। বলাই বাহুল্য, তাঁর কাছে সবাই সেদিন ম্লান। শুধুমাত্র সরলতা এবং অকপট স্বীকারোক্তির জন্যই তিনি বাকিদের থেকে আলাদা। তাঁর দলের আর কাউকে এত সহজ ভাষায় কথা বলতে শুনিনি।

ভাইরাল হয়েই থেকে গেল ‘‌এমন তো কতই হয়’‌

কিন্তু ওই যে ‘‌ইট হ্যাপেন্স’। একটি বাংলা কাগজে তার বাংলা তর্জমা হয়ে গেল ‘‌এমন তো কতই হয়।’ সেটাই দশকের পর দশক ধরে ভাষণে ভাষণে ছড়িয়ে গেল। কেউ কেউ নিজের মতো করে অতিরঞ্জিত করে বসলেন। আজও সেই অতিরঞ্জনের ট্রাডিশন চলছে। আজও কোথাও নারী নির্যাতন ঘটলে তৃণমূল নেতারা বলে থাকেন, ‘‌বাম আমলেও এসব হত। সেদিনের মুখ্যমন্ত্রী নির্লজ্জের মতো বলেছিলেন, এমন তো ঘটতেই পারে। এমন তো কতই হয়। এ নিয়ে হইচই করার কী আছে?‌’

জ্যোতি বসু, ছোট্ট নাম, বিরাট ব্যক্তিত্ব

সোশ্যাল মিডিয়ায় আচ্ছন্ন প্রজন্মের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, জ্যোতি বসু ঠিক কেমন ছিলেন। সিলেবাসেও নিজেকে ঢোকানোর চেষ্টা করেননি। নিজের কাজের ভিডিও করেও রাখেননি। ছবি তুলিয়েও রাখেননি। তাই ইউটিউব বা সবজান্তা গুগল ঘাঁটলেও বিরাট কিছু পাবেন না। ঢালাও বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচারের আনুকূল্যে জ্যোতি বাবুদের ভেসে থাকতে হয় না। তাঁরা থেকে যান কাজে। তাঁরা থেকে যান চেতনায়। ‘‌জ্যোতি বসু, ছোট্ট নাম, কী বিরাট ব্যক্তিত্ব’‌।‌

জ্যোতিবাবু থাকলে ফেসবুক ছেড়ে মানুষের কাছেই যেতে বলতেন

ফেসবুকে সারাক্ষণ মগ্ন থেকে, নিজেদের কর্মসূচির ছবি পোস্ট করে, পা পছন্দের পোস্টে লাইক দিয়ে একটা আত্মশ্লাঘা হতে পারে। তাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না। যদি সত্যিই জ্যোতিবাবুর প্রতি শ্রদ্ধা থাকে, তবে মানুষের কাছে যান। কেন মানুষের বিশ্বাস হারিয়েছিল, সেই কারণগুলো খুঁজে বের করুন। সম্ভব হলে শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করুন। দেখবেন, তখন আর তৃণমূলকে গালাগাল দেওয়ার দরকার পড়ছে না।

জ্যোতিবাবু জঙ্গলের বড় বাঘের মতো

জ্যোতিবাবুর কথা বলতে গিয়ে তাঁর চেলাদের কথা এত বলছি কেন? কারণ, একটা মানুষ কেমন, সেটা তাঁর সঙ্গীসাথীদের দেখেই বোঝা যায়। এই যে এতজনের কথা বললাম, এঁদের কাউকে আপনি অসৎ বলতে পারবেন না। এঁরা কেউ কিন্তু গাড়ি, বাড়ি বা টাকার জন্য রাজনীতি করতে আসেননি। অন্য পেশায় অনেক সফল হতে পারতেন। সব হাতছানি ছেড়ে এসেছেন। জ্যোতিবাবু ছিলেন এঁদের নেতা। এঁদের দেখেই বোঝা যায়, জ্যোতিবাবু কেমন ছিলেন।‌

ধর্মের নামে বিদ্বেষ নয়

ধর্ম আর রাজনীতির মাঝে সেই দেওয়ালটা যেন আর থাকছে না। কারও ইচ্ছে হল, তিনি এই বাংলায় বাবরি মসজিদ বানানোর হঙ্কার দিচ্ছেন। কেউ আবার ব্রিগেডের মাঠে ঘটা করে গীতা পাঠের আয়োজন করছেন। আর সেই গীতা পাঠকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বানিয়ে ফেলছেন। ভোট যত এগিয়ে আসবে, ধর্মের নামে এইসব কর্মকাণ্ড ততই বাড়বে।