শুনতেন বেশি, বলতেন কম

চাইলে মুকুল রায় সম্পর্কে বেশ কিছু খারাপ কথা বলাই যায়। আবার চাইলে ভাল কথাও বলা যায়।

মৃত্যুর পর খারাপ কথা বলার তেমন রেওয়াজ নেই। তাই বলে মৃত্যুর পর দেবত্ব আরোপ করতে হবে, এমনও নয়।

এই বাংলার রাজনীতিতে দলবদলের খারাপ সংস্কৃতি এনে দেওয়ার পিছনে বড় ভূমিকা ছিল এই মুকুল রায়ের। তাঁর দলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মনে হবে, নিজের দলকে, নিজের সংগঠনকে তিনি বড় করতে চেয়েছেন। অন্য শিবির থেকে যোগ্য লোকেদের ভাঙিয়ে এনেছেন, এতে অন্যায় কোথায়?‌

আসলে, মানুষ একজনকে নির্বাচিত করল। তাঁকে লোভ দেখিয়ে দলে টেনে নেওয়ার মধ্যে আর যাই হোক, কোনও নৈতিকতা নেই। বাংলার রাজনীতিতে ছোটখাটো দলবদল আগেও হয়েছে। কিন্তু বাম জমানায় অন্য দল থেকে নেতা ভাঙিয়ে আনার সংস্কৃতি তেমনভাবে ছিল না। তৃণমূল আসার পর সেটা মারাত্মক জায়গায় চলে গেছে। কখনও পুলিশকে কাজে লাগিয়ে, কখনও আত্মীয়দের অপহরণ করেও দলের পতাকা ধরানো হয়েছে। দলবদলের মতো এমন অনৈতিক একটা কাজও যে বাংলার রাজনীতিতে নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে, এর দায় তিনি অস্বীকার করতে পারেন না।

প্রশাসনকে শাসকদের কথা শুনে চলতে হয়। এটা সব জমানাতেই কম–‌বেশি সত্যি। কিন্তু জেলা প্রশাসনকে এতটা ন্যক্কারজনকভাবে গরু পাচার, বালি পাচার, কয়লা পাচারে এভাবে লেলিয়ে দেওয়া হয়নি। এই দুষ্কর্মটি শুরু মুকুল রায়ের হাত ধরেই। পরে আরেক দুষ্কৃতীর হাত ধরে তা পৌঁছে যায় অন্য মাত্রায়।

বাংলার রাজনীতিতে মুকুল রায়ের মূল্যায়ন করতে গেলে এই অপ্রিয় দিকগুলো এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। কিন্তু এর বাইরেও একটা অন্য মুকুল রায় ছিলেন। যিনি দলের কর্মীদের ভালবাসতেন। জেলা থেকে আসা, ব্লক থেকে আসা কর্মীদের যথাসম্ভব মর্যাদা দিতেন। অনেককেই নামে চিনতেন। ছোট ছোট সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেন। জেলা থেকে এসেছেন বলেই দূর ছাই করে তাড়িয়ে দিতেন না।

সবার সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অনেকের অনেক রকম উচ্চাকাঙ্খা থাকে, যা পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু অনেক অভিমান বা অভিযোগ সঙ্গত। সেগুলো শোনাটা জরুরি। অন্তত এই সহিষ্ণুতাটুকু তাঁর ছিল। সহজে রাগতেন না। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়, শুনতেন বেশি, বলতেন কম। এই গুণটি খুব কম রাজনীতিকের মধ্যেই দেখা যায়। মন দিয়ে অন্যের কথা শোনাটা যে জরুরি, এটা রাজনীতির প্রাথমিক একটা পাঠ। কিন্তু অনেকেই এই প্রাথমিক পাঠ ছাড়াই নেতা হয়ে যান। তাঁদের শোনার ধৈর্য কই?‌

Previous post সোনার কেল্লা পার্ট টু
Next post ঘরের পাশে, পড়শি দেশে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *