কার কী কাজ, সেটাই মাঝে মাঝে গুলিয়ে যায়। যাঁদের ধর্ম নিয়ে থাকার কথা, তাঁরা রাজনীতির আঙিনায় নেমে পড়েন। যাঁদের রাজনীতির আঙিনায় থাকার কথা, তাঁরা ধর্ম নিয়ে বেশি মেতে ওঠেন। ফলে, সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যায়।
ধর্ম আর রাজনীতির মাঝে সেই দেওয়ালটা যেন আর থাকছে না। কারও ইচ্ছে হল, তিনি এই বাংলায় বাবরি মসজিদ বানানোর হঙ্কার দিচ্ছেন। কেউ আবার ব্রিগেডের মাঠে ঘটা করে গীতা পাঠের আয়োজন করছেন। আর সেই গীতা পাঠকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বানিয়ে ফেলছেন। ভোট যত এগিয়ে আসবে, ধর্মের নামে এইসব কর্মকাণ্ড ততই বাড়বে।
ধর্ম পালনের অধিকার সবার আছে। নিজের নিজের ধর্ম পালন করুন, এতে আপত্তিরও কিছু নেই। কিন্তু ধর্মের নামে দেখনদারি যেন একটু বাড়াবাড়ি স্তরে পৌঁছেছে। রাজনীতির আঙিনায় যাঁরা রাম–রাম করে চলেছেন, তাঁদের অধিকাংশই রামায়নের একটা পাতাও পড়েননি। একটা অতি সাধারণ প্রশ্ন করুন, উত্তর পাওয়া যাবে না। ঠিক তেমনই, যাঁরা মসজিদ বানাতে উঠে পড়ে লেগেছেন, তাঁদের অধিকাংশই ইসলাম ধর্মের সারকথাই বোঝেননি। নিজের ধর্ম পালনের থেকেও অন্য ধর্মকে ছোট করে দেখানোর একটা প্রবণতাও প্রকট হয়ে উঠছে। ঘৃণা, বিদ্বেষকে উস্কে দেওয়া হচ্ছে। সেই কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে মূলস্রোত মিডিয়াকে। আর লাগামহীন সোশ্যাল মিডিয়া তো আছেই। আপনি চান বা না চান, আপনার ফোন বেয়ে সেইসব বিদ্বেষবাণী আপনার মগজে পৌঁছে যাচ্ছে।
অন্য কোথাও একটু আগুন লাগলেই হল। যতক্ষণ না সেই আগুন নিজের উঠোনে টেনে আনা হচ্ছে, ততক্ষণ যেন শান্তি নেই। বাংলাদেশের ঘটনা নিয়ে এই দেশের পরিবেশকে বিষিয়ে তোলার নিরন্তর চেষ্টা চলছে। সেখানকার কিছু উন্মত্ত নাগরিক এক আত্মঘাতী খেলায় নেমেছেন। হাতের সামনে যা পাচ্ছেন, তাই ভেঙে ফেলতে উদ্যত। কখনও তাঁরা ধর্মকে ঢাল করে লোক ক্ষেপাচ্ছেন। নিজের দেশেরই একের পর এক সৌধ ভেঙে ফেলছেন। নিজের দেশেই আচলাবস্থা তৈরি করতে চাইছেন।
আমাদের এখানেও তেমন দায়িত্বজ্ঞীনহীন লোকের অভাব নেই। তাঁরাও যেন অচলাবস্থা তৈরির খেলায় মেতেছেন। ওখানকার কিছু দুর্বৃত্তকে দেখিয়ে সাধারণ বাংলাদেশিদের ভারত বিদ্বেষী দেখানোর চেষ্টা করে চলেছেন। অথচ, দুই দেশের সম্পর্কের বুনিয়াদ অনেকদিনের। দুই দেশের আমজনতা একে অন্যের শত্রু নন। কিন্তু শত্রু বানানোর চেষ্টা চলছে। সেখানে কোনও সংখ্যালঘু আক্রান্ত হলে এখানে সোশ্যাল মিডিয়ায় যেন ঝড় বইছে। প্রতিবাদের নয়, আসলে বিদ্বেষের চোরাস্রোত।
ধর্মের এই লড়াইয়ে মানুষের আসল সমস্যাগুলোই আড়ালে চলে যাচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, কর্মসংস্থান— এসব নিয়ে আলোচনাই হচ্ছে না। অথচ, ভোটের আঙিনায় এই প্রশ্নগুলোই তো বেশি করে উঠে আসা উচিত। কে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার কতটুকু পালন হল, সেই আলোচনা থেকে পালিয়ে বেড়াতেই এত বিদ্বেষের আয়োজন। না, এঁরা ধর্মের উপাসক নন। এঁরা নিজের ব্যর্থতা আড়াল করতে ধর্মকে ব্যবহার করেন।
যাঁরা ধর্মের জিগির তুলে বাজার মাতিয়ে রাখছেন, তাঁদের কাছে অনুরোধ, রাজনীতিবিদ হিসেবে আপনাদের যে দায়িত্ব, সেটা পালন করুন। ধর্ম নিয়ে আপনাদের না ভাবলেও চলবে। নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে ধর্মকে ঢাল করবেন না।
Page 1 of 1 Page 1 of 1
