এই কমিশনকে পাসমার্ক দেওয়াও কঠিন

ভোটের আর এক সপ্তাহও বাকি নেই। কিন্তু এখনও ভোটার তালিকা চূড়ান্ত নয়। এখনও অন্তত সাতাশ লক্ষ মানুষ রয়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়। এসআইআর নিয়ে এত কাণ্ডের পর তা কার্যত প্রহসনেরই চেহারা নিল।
পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি না নিয়ে এসআইআর করতে গেলে কী ফল হয়, তা একেবারেই বেআব্রু হয়ে গেল। নির্বাচন কমিশনের কাজকর্মে স্বচ্ছ্বতার যেমন অভাব, তেমনই অভাব দূরদর্শিতার। নিজেরাই নিয়ম করছেন, নিজেরাই সেই নিয়ম লঙ্ঘন করছেন।

শুরু থেকেই নানা বিভ্রাট। একদিকে চলল লাগাতার হুমকি। ভুয়ো ভোটারের নাম কেটে তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। স্বভাবতই অনেকে আতঙ্কিত হলেন। ভোটার লিস্টে নাম থাকা বা না থাকার সঙ্গে যে নাগরিকত্বের কোনও সম্পর্ক নেই, নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে এমন কোনও আশ্বাস দেওয়া হল না। কোন কাগজ বৈধ, কোন কাগজ অবৈধ, তা নিয়েও বিস্তর ধোঁয়াশা। বারবার আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। প্রথমে বলা হয়েছিল, যাঁরা ২০০২ সালে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের কোনও কাগজ দেখাতে হবে না। তাঁদের দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই। কিন্তু লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে নোটিশ পাঠানো হল। ছোট ছোট নামের বানান ভুল বা পদবির বিভ্রাটেও বিস্তর হয়রানি। বাংলার নানা প্রান্তে চরম রোদে কয়েক লক্ষ মানুষকে দিনভর এই ভোগান্তির শিকার হতে হল। অদ্ভুত এক আতঙ্কের আবহ।

অথচ, একটু বিচক্ষণতা থাকলে, একটু দূরদর্শিতা থাকলে এই ভোগান্তি এড়ানো যেত। বারবার কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হত না। মনোনয়ন জমা হয়ে গেল, ভোট আর এক সপ্তাহও বাকি নেই। এখনও তালিকাই চূড়ান্ত হল না। এমনকী কোর্টও কার্যত হাত তুলে দিয়েছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে ষাট লক্ষ মানুষের অ্যাডজুডিকেশন যে সম্ভব নয়, বিচারপতিরাও এমনটা ভাবতে পারেননি। সাতাশ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে। বিরাট অংশের মানুষ বৈধ ভোটার হওয়া সত্ত্বেও এবার ভোট দিতে পারবেন না, তা মোটামুটি নিশ্চিত। না সরকার, না কোর্ট, না নির্বাচন কমিশন—কোনও পক্ষই আশার আলো দেখাতে পারছেন না। এরপর তাঁদের পরিণতি কী হবে, তাও জানা নেই। একে তো ভোট দিতে পেলেন না, তার ওপর কেউ তাঁদের দাগিয়ে দিচ্ছেন দেশদ্রোহী, কেউ বলছেন অনুপ্রবেশকারী। কেউ বলছেন, তাড়ানো হোক। এই দেশ যতটা নির্বাচন কমিশনের কর্তাদের, ততটাই এই নাগরিকদেরও। কিন্তু তাঁদের কোনও ভুল না থাকা সত্ত্বেও চরম সামাজিক অসম্মান ও লাঞ্ছনার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। শুধু ভোটাধিকার নয়, তাঁদের অস্তিত্ব নিয়েই উঠছে প্রশ্ন। নাগরিকের যেমন কিছু দায়িত্ব আছে, রাষ্ট্রেরও কিছু দায়িত্ব থাকে। সেই দায়িত্ব পালনে নির্বাচন কমিশনকে পাস নম্বর দেওয়া সত্যিই কঠিন।

Previous post কয়েক ঘণ্টা, সেই লামাদের মাঝে
Next post ‌এক লেখক অন্য লেখকের লেখা পড়ছে কই?‌

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *