তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে

অজয় কুমার

তিনি হুঙ্কার দিচ্ছেন। তিনি বারবার বলে চলেছেন, বিজেপিকে তৃণমূল হতে দেব না। আমাদের দরজা বন্ধ। কিন্তু কে শোনে কার কথা!‌ এ যেন, তু মান ইয়া না মান, ম্যায় তেরা মেহমান।

৪ মের পর থেকে শমীক ভট্টাচার্যের বিড়ম্বনা যেন বেড়েই চলেছে। তিনি যতই দরজা বন্ধ রাখতে চান, টেউ টোকা দিচ্ছেন। কেউ ধাক্কা দিচ্ছেন। কেউ পিছনের খিড়কির দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ছেন।

তৃণমূলের তিন রাজ্যসভা সাংসদের হঠাৎ বোধোদয় হল। এতদিন নেত্রী তাঁদের কাছে ছিলেন মা সারদার মতো। হঠাৎ মনে হল, এই নেত্রীর সঙ্গে থাকা যায় না। এই দল আর করা যায় না। তাঁরা সটান ছুটলেন দিল্লি। এর বাড়ি, ওর বাড়ি বৈঠক। প্রথমে পদত্যাগ। এই পর্যন্ত ঠিকই ছিল। কিন্তু তার কদিন যেতে না যেতেই দেখা গেল, এঁদের হাতেই বিজেপির পতাকা তুলে দেওয়া হল। কয়েক ঘণ্টা যেতে না যেতেই ঘোষণা হল, তাঁরাই রাজ্যসভার প্রার্থী। শমীকবাবুর বিড়ম্বনাটা ভাবুন। কদিন আগেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন, সবার জন্য দরজা বন্ধ। কিন্তু তাঁকেই হাতে পতাকা তুলে দিতে হচ্ছে। তাঁকেই উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করে নিতে হচ্ছে। এই মহান ‘‌দলবদলু’‌দের সম্পর্কে ভাল ভাল কথার যুক্তি সাজাতে হচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ তাঁকেই গালাগাল দিচ্ছেন। তাঁরা বুঝতেই পারছেন না যে, তাঁর কিছুই করার নেই। দিল্লি থেকে ফরমান আসছে। তাঁর মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। রাজ্যসভা সদস্যরা না হয় পদত্যাগ করে নতুন করে জিতে এলেন। কিন্তু লোকসভার লোকেদের তো সেই সাহস হবে না। অতএব, তাঁরা যে কোথায়, তাঁরা নিজেরাও জানেন না। কখনও বলছেন, আমরা এনডিএ শরিক। কখনও বলবেন, আমরাই আসল তৃণমূল। বেচারা শমীক ভট্টাচার্য। তাঁকে দিবারাত্র এই ‘‌সার্কাস’‌ দেখে যেতে হচ্ছে।

অথচ, এই শমীক ভট্টাচার্য ছিলেন আনুগত্যেরই প্রতীক। প্রায় তিন দশক ধরে তাঁর নাম শুনে আসছি। যখন বিজেপির একজনও বিধায়ক ছিল না, তখনও বিজেপিকে প্রাসঙ্গিক রাখতে যাঁদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল, তিনি তাঁদের একজন। দুরন্ত বক্তা। পড়াশোনা আছে। রসবোধ আছে। তার থেকেও বড় কথা, এতদিনের রাজনৈতিক জীবনে একটিও অসংলগ্ন কথা বলেছেন বলে মনে পড়ছে না। শালীনতার মাত্রা বজায় রেখেও রাজনৈতিক আক্রমণ করা যায়, বাংলার রাজনীতিতে শমীকবাবু অবশ্যই তার বড় একটা উদাহরণ।

কেন জানি না, দলবদলুদের ঠিক মেনে নিতে পারি না। যিনি যে দলের, সেই দলটাই মন দিয়ে করুন, কোনও সমস্যা নেই। ‘‌মানুষের কাজ’ করতে এত দল বদল করতে হয় কেন, বুঝি না। যে কোনও মানুষেরই রাজনৈতিক সততাটা খুব জরুরি। যেমন জরুরি বিষয় হল পড়াশোনা ও মাত্রাজ্ঞান। শমীকবাবু দল বদলাতে পারেন, এমন গুঞ্জন কখনও শুনেছেন?‌ যে তৃণমূল দল ভাঙানোয় এত পটু, তাঁরা কি শমীককে দলে টানার চেষ্টা করেনি? নিশ্চিতভাবেই তাঁর কাছেও প্রস্তাব গিয়েছিল। তাছাড়া, তিনি নিজেও যদি একবার আগ্রহ দেখাতেন, ক্যাবিনেটে জায়গা বাঁধা ছিল। লোকসভা বা রাজ্যসভাতেও যেতেই পারতেন। কিন্তু ‘‌সওদা’‌ করেননি।

অথচ দল যে তাঁকে সবসময় দারুণ মর্যাদা দিয়েছে, এমনও নয়। ২০২১ এ যখন ৭৭ জন বিধায়ক জিতে এলেন, দল চাইলে একজনকে রাজ্যসভায় পাঠাতেই পারত। কিন্তু কাকে পাঠানো হল?‌ কোন এক অনন্ত মহারাজকে। যিনি সকালে কী বলেন, বিকেলে কী বলেন, নিজেও জানেন না। যিনি বিজেপির সাংসদ হওয়ার পরেও তৃণমূল শিবিরে প্রায় চলেই গিয়েছিলেন। তখন কিন্তু পুরনো সৈনিক শমীকবাবুর কথা মনেও পড়েনি। দীর্ঘদিন দলের নানা সমীকরণে কোনও কমিটিতেই তাঁর জায়গা হয়নি। নিশ্চিতভাবেই মনে মনে কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু কখনও শিবির বদল করার কথা ভাবেননি। তাঁর বক্তৃতায় লোকখেপানো নেই, মিথ্যে তথ্যের বেসাতি নেই, নোঙরা আক্রমণ নেই। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে মন থেকে সবসময় একমত হতে পারি না, কিন্তু মন থেকে তাঁর পড়াশোনা ও বাগ্মিতাকে কুর্নিশ করতে দ্বিধা হয়নি। এই লোকটা কাল দল বদলে ফেলতে পারেন, কখনও এমনটা মনে হয়নি।

এমন একজন মানুষ কি সত্যিই চাইবেন দলটা দলবদলু আয়ারাম–‌গয়ারামে ভরে যাক?‌ কখনই চাইতে পারেন না। কিন্তু দিল্লির মাথারা যখন চাইছেন, তাঁর না চেয়ে উপায় নেই। একের পর এক তোলাবাজির খবর আসছে। মাঝে মাঝেই তিনি হুঙ্কার দিচ্ছে, বিজেপিতে এসব চলবে না। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। কে শোনে তাঁর কথা?‌ আসলে, তিনি হুঙ্কার দেওয়ায় কখনই অভ্যস্থ ছিলেন না। তাই হয়তো তাঁর হুঙ্কার নিচু তলা পর্যন্ত পৌঁছচ্ছে না।

পালাবলের পর অতি উৎসাহী বিজেপির অভাব নেই। কেউ অ্যাকাডেমিতে গেরুয়া রঙ লাগিয়ে দিচ্ছেন। কে যাদবপুরে তাণ্ডব করছেন। দেশপ্রেমিক বোঝাতে কেউ কেউ নানা উৎকট সব ফরমান জারি করছেন। একা শমীক কতদিকে আর সামাল দেবেন!‌ মাঝে মাঝেই বলতে হচ্ছে, এর সঙ্গে বিজেপির কোনও সম্পর্ক নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা মিম ঘোরাফেরা করে, কোনদিন হয়তো এই দুর্বৃত্তরা বলে বসবে, শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিজেপির কোনও সম্পর্ক নেই।

সহজ কথা, বিজেপির তৃণমূলীকরণ অনিবার্য। জাতীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে এমপিদের যদি নিতে হয়, তাহলে কাউন্সিলর বা পঞ্চায়েত মেম্বাররা কী দোষ করল?‌ তাঁরাও আগাছার মতো ঠিক ঢুকে পড়বেন। নিচু তলায় ঠিক ‘‌সওদা’‌ হয়ে যাবে। পুরসভা হোক বা পঞ্চায়েত, আদি বিজেপিরা নয়, তৃণমূল থেকে আসা লোকেরাই সংখ্যায় ভারী হবেন।

একদিকে দিল্লির কর্তারা অন্য রাজ্যে সরকার ভেঙে অভ্যস্থ। তাঁদের কাছে অন্য দল থেকে এম পি নেওয়া কোনও ‘‌অপরাধ’‌ই নয়। সেটাকে তাঁরা কৃতিত্বই মনে করেন। অন্যদিকে, নিচু তলাতেও পিল পিল করে ঢুকবে আবর্জনা। বেচারা শমীক, মাঝখানে পড়ে তাঁর স্যান্ডউইচের মতো দশা। তিনিই মধ্যম। কিন্তু তফাতে চলবেন, সে উপায়ও নেই। ‌

Previous post ‌একা কুণাল রক্ষাকরেন নকল বুঁদিগড়
Next post শরিকের চেয়ে বড় শত্রু নেই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *