সরল বিশ্বাস
তিনি কি বদলে গেছেন? তিনি কি রত্নাকর থেকে বাল্মীকি হয়ে গেছেন? অন্তত তাঁর কমেন্ট বক্সের লেখাগুলো পড়লে তেমনটাই মনে হয়। আসলে, তিনি যেমন ছিলেন, তেমনই আছেন। বদলে গেছে তাঁকে দেখার চোখ।
মাস ছয়েক আগেও তিনি ছিলেন নিন্দিত এক চরিত্র। কারণে–অকারণে কত গালাগাল তাঁকে লক্ষ্য করে ধেয়ে এসেছে। তিনি যদি বলতেন, সূর্য পূর্বদিকে ওঠে, তাতেও যেন রে রে করে তেড়ে আসতেন নেটিজেনরা। যেন মহাপাপ করেছেন। নানা বিশেষণে ভরিয়ে দেওয়া হত তাঁর কমেন্ট বক্স। তিনিও কম যান না। তিনিও বাক্যালঙ্কার অব্যয়ের লড়াইয়ে পাল্লা দিয়ে লড়ে যেতেন।
কেউ কেউ বলে থাকেন, ক্ষমতায় থাকলেই মানুষকে আসল চেনা যায়। কুণাল ঘোষের ক্ষেত্রে হয়তো বিষয়টা অন্যরকম। তাঁকে আরও ভাল করে চেনা গেল তৃণমূল ক্ষমতা হারানোর পর। তাঁকে ঘিরে রাগ, বিরক্তি সব যেন বদলে গেছে অদ্ভুত এক ভাল লাগায়।
কুণাল ঘোষ বরাবরই এক বিতর্কিত চরিত্র। বিরোধীদের জন্য যতটা বিপজ্জনক, দলের লোকেদের জন্য বোধ হয তার থেকেও বেশি বিপজ্জনক। অনেকেই সারদার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তাঁর জেল খাটার প্রসঙ্গ টেনে এনে তাঁকে আক্রমণ করেন। আচ্ছা, তিনি কেন জেলে গিয়েছিলেন? সারদার কোনও টাকা নয়ছয়ের জন্য? তাঁকে তো সিবিআই বা ইডি গ্রেপ্তার করেনি। তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল রাজ্য পুলিশ। কেন গ্রেপ্তার? সহজ কথা, তিনি দলের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন। তিনি বাইরে থাকলে দলকে আরও বিব্রত হতে হত।
ছাড়া পেয়ে একটু একটু করে আবার মূলস্রোতে ফিরেছেন। মুখপত্রের দায়িত্ব নিয়ে বিপক্ষকে কড়া ট্যাকল করেছেন। বা ব্যাট হাতে উড়িয়ে দিয়েছেন গ্যালারির বাইরে। কিন্তু কখনও কখনও সেমসাইড গোলও করে বসেছেন। নিজের পার্টি অফিসে বসে প্রেস কনফারেন্সে নিজের দলের নেতার বিরুদ্ধেই তোপ দেগেছেন। সাসপেন্ডও হয়েছেন। কাজেই তিনি যে দারুণ ‘অনুগত’ এমনটাও বলা যাবে না।
আসল আনুগত্য কখন বোঝা যায়? যখন দল ক্ষমতায় থাকে না। একসময় তালে তাল দিয়ে যাওয়া, দন্ত বিগলিত করা অনুগত সৈনিকরা আজ অন্য শিবিরে। তাঁদের কাছে এখন তৃণমূলের চেয়ে খারাপ দল নেই। মমতার চেয়ে খারাপ নেত্রী নেই। কিন্তু এমন কঠিন সময়ে কুণাল ঘোষ দেখিয়ে দিচ্ছেন, আনুগত্য কাকে বলে। মোদ্দা কথা, ‘যে দলের টিকিটে আমি জিতে এসেছি, জিতে আসার পর সেই দল ছেড়ে যাব না। যদি অভিযোগ থাকে, দলের ভেতর বলব।’ অথচ, এই সাধারণ মূল্যবোধটুকু বাকিদের আচরণে দেখা যাচ্ছে না। তাঁদের কেউ শাসকের ‘অনুগত’ বিরোধী। কেউ এনডিএ–র শরিক। কেউ জল মাপছেন।
কুণাল একাই যেন নকল বুঁদিগড় রক্ষা করে চলেছেন। বিধানসভায় তাঁকে সামলাতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে শাসক দল। কখনও তাঁকে মার্শাল ডেকে বের করে দিতে হচ্ছে। কখনও মশা মারতে কামান দাগার মতো প্রিভিলেজ মোশন আনতে হচ্ছে। কখনও ডিম ছুঁড়ে হেনস্থা করতে হচ্ছে। কখনও রাস্তা আটকাতে হচ্ছে। কিছুতেই পেরে ওঠা যাচ্ছে না।
অথচ, তৃণমূল যদি চতুর্থবার ক্ষমতায় আসত! নিশ্চিতভাবেই ক্যাবিনেটে তাঁর জায়গা হত না। দিদিমণি চাইলেও ভাইপো দায়িত্ব নিয়ে নাম কেটে দিতেন। নবান্ন আলো করে বসে থাকতেন তাঁরাই, যাঁরা আজ গিরগিটির মতো রঙ বদলে নিয়েছেন। জোড়া ফুলের প্রতীকে জিতে এসে পদ্মফুলের পায়ের তলায় হামাগুড়ি খাচ্ছেন। আপাতত সাজানো বিরোধী। ভোটের আগে মুখোশ ছেড়ে সরাসরি পদ্ম পতাকা ধরে নেবেন, এমনই বলা যায়। কুণাল সেই নিষ্ফলের, হতাশের দলেই থেকে যেতেন। অন্যরা অপকর্ম করতেন, আর তিনি গাল খেয়ে যেতেন। তাঁর কমেন্ট বক্স ভরে উঠত বাছা বাছা বিশেষণে। মাঝে মাঝে সত্যিই বিস্ময় জাগত, এতকিছুর পরেও মাথা ঠান্ডা রাখেন কীভাবে?
সময় অনেক কিছু বেআব্রু করে দেয়। সময় যেমন বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, ভাইপো আসলে কতটা ভুঁইফোড় ছিলেন। সময় বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, একসময় যাঁরা মমতা ব্যানার্জিকে দেবী বলতেন, তাঁরা একে একে সব অন্য শিবিরে, তাঁর ছায়াও মাড়াচ্ছেন না। যাঁরা কদিন আগেও বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক বলে গালি পাড়তেন, তাঁরা কী অবলীলায় ‘সনাতনী’ সেজে বিভেদমূলক মন্তব্য করছেন। ঠিক তেমনই, সময় বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, কুণাল ঘোষ বাকিদের মতো ডিগবাজি মারার বান্দা নন। শাসকের একের পর এক বিষাক্ত বাউন্সারেও তিনি বুক চিতিয়ে লড়ে যাচ্ছেন।
রাজনীতি তাঁকে অনেককিছু দিয়েছিল। আবার কেড়েও নিয়েছিল। পথের এ যেন এক নতুন বাঁক। যে বাঁকে এসে হল তাঁর পুনর্জন্ম। কমেন্ট বক্সের ওই বদলে যাওয়া সুর যেন তারই নিদর্শন।
