বৃষ্টি চৌধুরি
গ্রামের হাসপাতাল। নামেই হাসপাতাল। দরজা আছে, জানলা আছে, ডাক্তার আছেন। হয়তো একটা স্টেথোস্কোপও আছে। নেই শুধু রোগী। হাসপাতালের উঠোনে রোগীর ভিড়ের বদলে আগাছা মাথা তোলে। ওষুধ আছে কি না জানা নেই, কিন্তু মানুষের বিশ্বাস নেই। শহর থেকে আসা ডাক্তারটি প্রথম দিনেই বুঝে যান—এখানে তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ প্রেসক্রিপশন লেখা নয়। মানুষকে হাসপাতালে ফিরিয়ে আনা।
এই জায়গা থেকেই শুরু ‘গ্রাম চিকিৎসালয়’। TVF-এর তৈরি এই হিন্দি ওয়েব সিরিজের গল্প ভাটকান্ডি গ্রামের প্রায় এক পরিত্যক্ত এক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে ঘিরে। শহুরে মেডিক্যাল শিক্ষায় তৈরি তরুণ ডাক্তার প্রভাত সিংহ এখানে এসে যেন অন্য এক ভারতের মুখোমুখি হন। এখানে রোগী চিকিৎসকের কাছে আসে না। চিকিৎসককেই পৌঁছতে হয় রোগীর কাছে। আর সেই পথ শুধু মাটির রাস্তা দিয়ে তৈরি নয়—তার মধ্যে মিশে থাকে কুসংস্কার, অভ্যাস, দারিদ্র্য, অবিশ্বাস, স্থানীয় রাজনীতি এবং বহু বছরের জমে থাকা ক্ষত।
ডাঃ প্রভাতের ভূমিকায় আমোল পরাশর। চরিত্রটির মধ্যে কোনও নায়কোচিত আড়ম্বর নেই। বরং আছে বিরক্তি, অসহায়তা, ভুল করা, আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা। প্রথম দিকে তাঁর মনে হয়, তিনি যেন ভুল জায়গায় এসে পড়েছেন। কিন্তু ধীরে ধীরে ভাটকান্ডির মানুষ তাঁর কাছে ‘কেস’ নয়, মানুষ হয়ে উঠতে শুরু করে। আর সেখানেই বদলে যায় প্রভাতও। এই বদলে যাওয়াটাই সিরিজটির প্রাণ।
অন্যান্য চরিত্রগুলিকেও ভাল আর মন্দর মোড়কে না ফেলাই ভাল। নানা রঙের মিশেল। ভালর মধ্যে মন্দ যেমন আছে, আবার মন্দের মধ্যে ভালর সন্ধানও আছে। হাতুড়ে চিকিৎসকের মধ্যেও যেমন মানুষের অসহায়তার সুযোগ নেওয়ার প্রবণতা আছে, তেমনই আছে মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা। সরকারি ব্যবস্থার মানুষটির মধ্যেও যেমন দায়িত্বহীনতা আছে, তেমনই আছে নিজের মতো করে কিছু করার চেষ্টা। এই ধূসর জায়গাটাই ‘গ্রাম চিকিৎসালয়’-কে আলাদা করে।
কারণ সিরিজটি গ্রামকে সুন্দর করে দেখানোর চেষ্টা করেনি। এখানে সর্ষে-ফুলের ক্ষেত আছে, কিন্তু তার পাশেই আছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অব্যবস্থা। এখানে মানুষ অতিথিপরায়ণ, আবার কুসংস্কারেও বিশ্বাসী। এখানে সম্পর্কের উষ্ণতা আছে, আবার জাতপাত, অর্থাভাব, শিক্ষার অভাবও আছে। অর্থাৎ গ্রাম কোনও ছবির পোস্টকার্ড নয়। গ্রামও একটি জীবন্ত সমাজ।
একজন মানুষ কেন সরকারি হাসপাতাল ছেড়ে হাতুড়ে চিকিৎসকের কাছে যায়? কেন হাসপাতালের বিছানা খালি পড়ে থাকে? কেন একজন ডাক্তারকে গ্রামের মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে হয়? কেন স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা তৈরি করাও চিকিৎসারই অংশ? প্রশ্ন উঠবে। উত্তর কোথাও স্পষ্ট, আবার কোথাও আবছা।
এই কারণেই ‘গ্রাম চিকিৎসালয়’ দেখতে দেখতে কখনও হাসি পায়, কখনও মন খারাপ হয়। কখনও মনে হয়, আমরা শহরে বসে গ্রামের মানুষকে কত সহজে বিচার করি। অথচ তাদের জীবন, ভয়, অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস—এসবের ভিতরে না ঢুকে তাদের সিদ্ধান্তের বিচার করা কত সহজ!
‘পঞ্চায়েত’-এর মতোই এখানে গ্রাম আছে, কিন্তু এই গ্রামের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়তে হয় আরও গভীরে। প্রশাসন নয়, এখানে আলোচনার কেন্দ্রে স্বাস্থ্য। হাসপাতাল নয়, আসলে আলোচনার কেন্দ্রে মানুষ। আর সেই মানুষগুলির সঙ্গে পরিচিত হতে গিয়েই সিরিজটি একসময় নিছক বিনোদন থাকে না। শহরের মানুষ হিসেবে আমরা গ্রামের কথা বলি। গ্রামকে ভালোবাসার কথাও বলি। কিন্তু কতটা চিনি?
‘গ্রাম চিকিৎসালয়’ সেই চেনার সুযোগ দেয়। শেখায়, গ্রাম মানে শুধু সবুজ মাঠ নয়। গ্রাম মানে অসংখ্য মানুষের জীবন, হাসি-কান্না, ভয়, ভুল, অভিমান, বেঁচে থাকার লড়াই। সেই মানুষদের কাছে পৌঁছতে গেলে শুধু হাসপাতাল বানালেই হয় না, দরকার আস্থা।
সিরিজটি শেষ হয়ে গেলে তাই ভাটকান্ডিকে একটু মনে পড়ে। মনে হয়, কোথাও একটা ছোট্ট হাসপাতালের উঠোনে এখনও হয়তো আগাছা গজিয়ে আছে। হয়তো কোনও ডাক্তার বসে আছেন রোগীর অপেক্ষায়। আর দূরের কোনও গ্রাম থেকে একজন মানুষ ধীরে ধীরে সেই হাসপাতালের দিকে হাঁটছেন। সেই হাঁটাটুকুই হয়তো বদলের শুরু।
‘গ্রাম চিকিৎসালয়’ তাই শুধু একটি ওয়েব সিরিজ নয়। এটি শহর থেকে গ্রামের দিকে তাকানোর একটি জানলা। আর সেই জানলা দিয়ে একবার তাকালে—গ্রামকে হয়তো আর আগের মতো দেখা যায় না।
