‌মেসির মধ্যে তো মারাদোনাকেই খুঁজি

স্বরূপ গোস্বামী

তিনি একজন বেঁটে মানুষ। একেবারেই খামখেয়ালি। কখনও শিশুর মতো সরল, কখনও চূড়ান্ত বদমেজাজি। থাকেন সুদূর লাতিন আমেরিকায়। কিন্তু এই চরম বেআক্কেলে লোকটাই বদলে দিলেন বাঙালির ভাবনার ভুবন।

এমনিতে বাঙালির জীবনে মেরুকরণের কোনও অভাব ছিল না। কেউ সিপিএম, তো কেউ কংগ্রেস। কেউ মোহনবাগান তো কেউ ইস্টবেঙ্গল। প্রতিষ্ঠান থেকে যদি ব্যক্তিতে নেমে আসেন, তাহলে কেউ উত্তম কুমার বলতে অজ্ঞান, তো কেউ সৌমিত্র অনুরাগী। কেউ পিকে ব্যানার্জি‌র ভক্ত, তো কারও ভাল লাগে অমল দত্তকে। কেউ হেমন্ত অনুরাগী, তো কারও পছন্দ মান্না দে। তিনি এসব কিছুই বোঝেন না। এক লহমায় সব সমীকরণ গুলিয়ে দিলেন। সব পন্থীকে মিলিয়ে দিলেন। বলা যায়, নিজেই এক মেরুকরণের জন্ম দিলেন।

বাঙালির জীবনে ছিয়াশির আগে আর ছিয়াশির পরে, সম্পূর্ণ দুটো ভিন্ন টাইমলাইন। এই দুই সময়ের মাঝে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেই খামখেয়ালি মানুষটা। দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনা। বাঙালির চিন্তা–‌চেতনার জগতে এল উথাল পাথাল করা এক ঢেউ। বাঁ পায়ের আলতো টোকায় কত কিছু গড়ছেন, কতকিছু ভাঙছেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায়, ‘‌অপরূপভাবে ভাঙা, গড়ার চেয়েও মূল্যবান কখনো সখনো।’‌

আগন্তুক ছবিতে সারা বিশ্ব ঘুরে আসা উৎপল দত্তর সংলাপ, ‘‌ফুটবলের ব্যাপারে আমার বিদ্যা ভয়ঙ্করী। মোহনবাগান অ্যান্ড ইস্টবেঙ্গল, দ্য লিমিট অফ মাই নলেজ।’‌ উৎপল দত্তর সেই সংলাপ আসলে চিরন্তন বাঙালির মনেরই কথা। বিশ্ব ফুটবল নিয়ে আমাদের কতটুকুই বা আগ্রহ ছিল!‌ আমরা ইস্টবেঙ্গল–‌মোহনবাগান, এই চেনা গণ্ডির আবর্তেই তো ঘুরপাক খেতাম। টিভি নামক বস্তুটি সবে পা রেখেছে সাতের দশকের মাঝামাঝি। শহুরে উচ্চিত্তর বেড়া ডিঙিয়ে মফস্বলে মধ্যবিত্তর আঙিনায় পৌঁছোতে প্রায় এক দশক লেগে যায়। ততদিনে পেলে নামক ফুটবল সম্রাট ‘‌প্রাক্তন’‌ হয়ে গিয়েছেন। সরাসরি টিভিতে তাঁকে দেখার কোনও সুযোগই ছিল না। কাগজেই বা বিশ্ব ফুটবলের খবর কতটুকু থাকত!‌ ইন্টারনেট, গুগল, ইউটিউব— এসব শব্দগুলো তো তখন ভবিষ্যতের গর্ভে।

আঠাত্তরের বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনা জিতল ঠিকই, কিন্তু বাঙালির মানসপটে কোনও অভিঘাত তৈরি হয়নি। মারিও কেম্পেসদের নিয়ে কোনও আলোড়নই ছিল না। এবার বিরাশি। সেমিফাইনাল আর ফাইনাল টিভিতে দেখানোর কথা। কিন্তু তখন কজনের বাড়িতেই বা টিভি এসেছে!‌ যাঁরা প্রবল উৎসাহী, তাঁদের কেউ কেউ বড়জোর পাড়া–‌পড়শীর ঘরে উঁকি মেরেছিলেন। পাওলো রোশির ইতালি তৃতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই রক্ষণশীল ঘরানা বাঙালির হৃদয়ে তেমন ছাপ ফেলেনি।

বাঙালি আসল সাবালক হল ছিয়াশিতে। ততদিনে শহরে তো বটেই, জেলা বা ব্লক শহরেও অনেকের ছাদেই উঁকি মারছে অ্যান্টেনা। কখনও কাক এসে বসছে। কখনও বানর এসে বুঝতে না পেরে সেই অ্যান্টেনা এদিক–‌ওদিক ঘুরিয়ে দিচ্ছে। বিভিন্ন ক্লাবেও এসে গেছে টেলিভিশন। ঘরে খেলা দেখে মজা হয় নাকি!‌ অতএব, চলো ক্লাবে। সেখানে হইহুল্লোড় করে দেখা যাক। বল জালে গেলেই গো–‌ল বলে সেই গগনভেদী চিৎকার। সেই চিৎকারে শিক্ষকের গলা যেমন আছে, তেমনই মিশে আছে ছাত্রের গলাও। বাবার কণ্ঠ যেমন আছে, তেমনই আছে ছেলের কণ্ঠও। কত প্রজন্ম যেন এক চিৎকারে মিশে গেল। সেই প্রথম বাঙালি সাবালক হল। সেই প্রথম বাঙালি ফুটবলের জন্য রাত জাগতে শিখল। সেই প্রথম বাঙালি দেশ, মহাদেশের বেড়া ভেঙে এভাবে কাউকে আপন করে নিতে শিখল। একটা ছিয়াশি, মানুষকে কতকিছু শিখিয়ে দিয়ে গেল!‌

এতদিন বাঙালি অনেকটাই ঝুঁকেছিল ব্রাজিলের দিকে। আরও ভালভাবে বলতে গেলে, পেলের দেশের দিকে। একজন মানুষ যদি কোনও দেশকে তিন–‌তিনবার বিশ্বকাপ এনে দেন, তখন তিনি আর নিছক মানব নন, মহামানব। তখন তাঁকে, তাঁর দেশকে সমর্থন করা ছাড়া উপায়ও থাকে না। লাতিন আমেরিকার পিছিয়ে পড়া একটা দেশ, শুধু ফুটবলের জোরে বিশ্বের শক্তিমান দেশগুলোকে হারিয়ে দিচ্ছে। এ তো নিছক ফুটবল নয়, বিশ্বমঞ্চে জীবনের জয়গান। হলুদ সর্ষে খেতের মতোই মাঠেও যেন হলুদ ঢেউ। পেলের উত্তরসূরি হিসেবে জিকো, সক্রেটিসরাও বেশ সমাদৃত হলেন।

কিন্তু ওই যে ছিয়াশি, সবকিছু উথাল–‌পাথাল রে দেওয়ার বছর। অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার বছর। পেলের পাশে ছিলেন ডিডি, ভাবা, গ্যারিঞ্চার মতো কিংবদন্তিরা। কাকে ছেড়ে কার কথা বলবেন!‌ পেলের প্রকাণ্ড ছায়ায় হয়তো কিছুটা ঢাকা পড়ে গেছেন। কিন্তু আর্জেন্টিনাকে বলা হত ‘‌মারাদোনা এবং বাকি দশজন।’‌ বুরুচাগা, পাসারেলা, বাতিস্তা, ভালদানোরা ছিলেন ঠিকই, কিন্তু ধারে–‌ভারে মারাদোনার ধারেকাছেও আসেন না। তাঁরা যেন চন্দ্রের মতো, সূর্যের আলোয় আলোকিত। ছোটখাটো মানুষটা একাই যেন সব হিসেব উল্টে দিচ্ছেন। অনায়াসে চারজন–‌পাঁচজনকে কাটাচ্ছেন, ঠিকানা লেখা পাস বাড়াচ্ছেন। বিপক্ষের তিনজন, চারজনকে ঘাড়ে নিয়ে ঘুরছেন। ফলে, সতীর্থরা অনেকটা ফাঁকা জায়গা পেয়ে যাচ্ছেন। যেখানে তিনি আছেন, সেখানে তো আছেনই। যেখানে তিনি নেই, সেখানেও যেন তাঁর অদৃশ্য উপস্থিতি। রক্তমাংসের একজন মানুষের পক্ষে এতকিছুও সম্ভব!‌ উল্লাস মিশে যাচ্ছে অশ্রুতে। হে আনন্দাশ্রু, তুমি দীর্ঘজীবী হও। ‘‌ঝরেছো বৃষ্টি হয়ে আগেও তুমি, আবার ঝরো।’‌

মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল দেখতে অভ্যস্থ আমাদের চোখ। হঠাৎ করে লাতিন আমেরিকার এই শিল্পের ঝলক। বাঙালির রাত জাগা সার্থক। কোথায় আর্জেন্টিনা, কোথায় ফিফার মানচিত্রে ধূসর ভারত। প্রাণে খুশির তুফান যেমন উঠে গেল, তেমনই মুগ্ধতা পৌঁছে গেল অন্য উচ্চতায়। এতদিন যে বাংলা ছিল ব্রাজিলের ডেরা, তার অর্ধেক হৃদয় হয়ে বিরাজ করল আর্জেন্টিনা। কোথাও হলুদ রঙের ঝিলিক, তো কোথাও নীল–‌সাদার দৃষ্টিসুখ।

এই মারাদোনাকে কি আমরা পরে দেখিনি?‌ আরও দুটো বিশ্বকাপে দেখেছি। নব্বইয়ে প্রায় একার কৃতিত্বে দলকে নিয়ে গেলেন ফাইনালে। শেষবেলার পেনাল্টিতে আর্জেন্টিনার স্বপ্নভঙ্গ হল ঠিকই, কিন্তু জার্মানির জয় সেদিন যেন ম্লান হয়ে গিয়েছিল মারাদোনার কান্নায়। সেই কান্না সংক্রমিত হয়েছিল নদীমাতৃক এই বাংলাতেও। চার বছর পর, এবার তাঁর বয়স অনেকটাই বেড়েছে। ক্ষিপ্রতা কমেছে। আর্জেন্টিনা দলের সেই ধারও নেই। তবু মন যে মানতে চায় না!‌ কারণ, ওই যে, মারাদোনা আছেন। কিন্তু গ্রুপ পর্বেই বিশ্বকাপ এমন নিষ্প্রদীপ হয়ে যাবে, কে ভেবেছিল!‌ স্বপ্নের মহানায়ককে কিনা নির্বাসিত হতে হল ডোপিংয়ের জন্য! এফিড্রিন না কী যেন একটা পাওয়া গেল। এত বছর পর নামটা মনে থাকার কথা নয়। তবু মনে আছে, সে তো মারাদোনার জন্যই।‌ ২৪ বছর পর সেবার ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হল ঠিকই, কিন্তু আর্জেন্টিনা শুরুতেই বিদায় নেওয়ায় অর্ধেক জৌলুস যেন হারিয়ে গেল। ঝলমলে বিশ্বকাপ যেন এক লহমায় ফিকে হয়ে গেল।

তুল্যমূল্য লড়াইয়ে তাহলে কী দাঁড়াল?‌ পেলের মুকুটে তিনটি বিশ্বকাপের ট্রফি। আর মারাদোনার ঝুলিতে!‌ মাত্র একটি। বিরাশিতে লালকার্ড দেখে বাইরে। ছিয়াশিতে চ্যাম্পিয়নের ট্রফি। নব্বইয়ে রানার্স। আর শেষবার কলঙ্ক মাথায় নিয়ে নির্বাসন। পেলে ৩, মারাদোনা ১। স্কোরলাইনে ফারাক অনেকটাই। কিন্তু হৃদয় কবে আর স্কোরলাইনের তোয়াক্কা করে!‌ তাই মারাদোনা নির্বাসিত হওয়ার পরেও এই শহর তাঁকে ধিক্কার জানায়নি। বরং, ফিফাকেই চক্রান্তকারী ভেবেছে। এমনকী পেলেকে সেই চক্রান্তের অংশীদারও ভেবেছেন কেউ কেউ। কবার মুকুটে ট্রফি উঠল, সেই তুল্যমূল্য হিসেব করেনি। মারাদোনাকে চিরবিদ্রোহী মনে করে মনের মাঝে স্থায়ী আসন দিয়েছে।

সেই ভালবাসার ব্যাটনই তো এখন মেসির হাতে। বারবার বাঙালি চেয়েছে, ছিয়াশির পর মেসির মুকুটে অন্তত একবার বিশ্বকাপ উঠুক। সেই স্বপ্নপূরণ হয়েছে কাতারে। অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন, সেটাই মেসির শেষ বিশ্বকাপ। যে কোনও দিনই হয়তো অবসর ঘোষণা করবেন। মাসের পর মাস পেরিয়ে গিয়েছে। মেসি থেকে গেছেন স্বমহিমায়। বয়স যতই চল্লিশ ছুঁই ছুঁই হোক, এবারও মেসিই সেরা আকর্ষণ। প্রথম ম্যাচেই দুরন্ত হ্যাটট্রিক। দ্বিতীয় ম্যাচেও জোড়া গোল। তৃতীয় ম্যাচের আগেই পরের রাউন্ডের ছাড়পত্র পেয়ে গেছে। কোচ স্কালোনি নামালেন বিরতির অনেক পরে। সোনার বুটের লড়াইয়ে অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন মেসি। পিছনে তাড়া করছিলেন এমবাপে। এই অবস্থায় গুরুত্বহীন ম্যাচেও খেলতেই পারতেন। কারণ, তাতে গোলসংখ্যা বাড়িয়ে রাখার সুবর্ণ সুযোগ ছিল। কিন্তু মেসি জানতেন, গোল সংখ্যা বাড়িয়ে রাখা নয়, বরং পরের রাউন্ডে তাঁকে আরও বেশি দরকার। তাই গোলের হাতছানি ভুলে বসলেন রিজার্ভ বেঞ্চে। এতবড় হৃদয় কজনের থাকে!‌ তবু যেটুকু সুযোগ পেলেন, এমন নিখুঁত ফ্রিকিক, মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতোই। পাঁচ গোলের মধ্যে তাঁর নামের পাশে মাত্র একটা গোল। ওই সিংহহৃদয়ের কথা তো স্কোরলাইনে থাকবে না। থাকার কথাও নয়।

কতদূর যাবে মেসির দল?‌ এখনও পরিষ্কার নয়। একের পর এক অঘটন ঘটেই চলেছে। কখনও ছিটকে যাচ্ছে জার্মানি, কখনও নেদারল্যান্ডস। আফ্রিকা দলগুলি উঠে আসছে সবাইকে চমকে দিয়ে। এবার আফ্রিকা থেকে অংশ নিয়েছিল দশটি দেশ। তিউনিশিয়া ছাড়া বাকি নটি দেশই কিনা পৌঁছে গেল নকআউটে!‌ কখনও কঙ্গো, কখনও কেপ ভার্দের মতো দেশ চমকে দিয়ে যাচ্ছে। এটাই তো বিশ্বকাপের বড় পাওনা। টগবগিয়ে ছুটছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাও। নেইমার থেকেও কার্যত নেই, সেই অভাব চমৎকার ঢেকে দিয়ে যাচ্ছেন ভিনিসিয়াস জুনিয়ার। বয়স অনেকটাই থাবা বসিয়েছে। তবু মাঝে মাঝেই ঝলক দিয়ে গেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। আর মেসি!‌ বয়সকে হার মানিয়ে তিনি তো চিরকালীন।

‘‌অধরা মাধুরী’‌ ধরা দিয়েছে কাতারেই। আর কী চাই মেসির?‌ ছিয়াশির পর নব্বইয়ে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল মারাদোনার। আসলে, প্রত্যাশার কোনও সীমা নেই। স্বপ্নের যদি সীমাই থাকল, তাহলে তা স্বপ্ন কীসের?‌ মেসির হাতে পরপর দু’‌বার কি ধরা দেবে বিশ্বকাপ?‌ সময় বলবে। যেটা মারাদোনা পারেননি, সারা বিশ্ব চাইছে, মেসি অন্তত সেই কীর্তি স্থাপন করুন। ছাপিয়ে যাওয়া নয়, মারাদোনার অপূর্ণ মাইলস্টোনকে যেন স্পর্শ করা। তাঁর জয় মানে তো মারাদোনারই জয়। মেসি তো আসলে একটুকরো মারাদোনাই।

Previous post ক্রীড়া সাংবাদিকতা!‌ রিফ্লেক্টেড গ্লোরিতেই আচ্ছন্ন
Next post পিছনে পড়ে রইল সেই শালবন, কিরিবুরুর সেই মেঘ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *