নিজেদের গুন্ডাদের আগে সামলান

‌স্বরূপ গোস্বামী

গুন্ডাদমন বিল বলে কথা। একটু চড়া সুরে কথা না বললে প্রেস্টিজ থাকে না। হলই না হয় বিধানসভা। একটু চিৎকার না করলে হয়!‌

গুন্ডামি করলে তাকে গ্রেপ্তার করা। এ আর নতুন কথা কী?‌ সম্রাট অশোকেরও আগে থেকে মোটামুটি এটাই নিয়ম। আগের সরকার না হয় গুটিয়ে থাকত। এই সরকার না হয় সাহসী। তারা না হয় ব্যবস্থা নেবে। তার জন্য এত ঘটনা করে বাড়তি আইন আনার কী দরকার?‌

আসলে, কয়েকটা বাড়তি বিষয় আছে, যা প্রচলিত আইনে ছিল না। কাউকে সন্দেহভাজন মনে হলেই দাও ফাটকে পুরে। আটকে রাখো এক বছর। কোর্টে তোলার দরকার নেই। জবাবদিহির দায় নেই। যে প্রশ্ন তুলবে, দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দাও। আগে এক বছর আটকে রাখো। প্রমাণ না করা গেলে না হয় ছেড়ে দেওয়া যাবে। এমন একটা অমানবিক বিষয়কে কিনা আইনের আওতায় আনা হল। তাই গলা ফুলিয়ে, চিৎকার করে এই ঢক্কা নিনাদ।

সেই সঙ্গে কারও নামে ভাঙচুরের মামলা ঠিকঠাক দিতে পারলেই তার জেল তো হবেই, উল্টে ক্ষতিপূরণ হিসেবে পরিবারের সম্পত্তি বিক্রি করা হবে। অর্থাৎ, মড়ার ওপর খাড়ার ঘা। যদি কাউকে মিথ্যে মামলায় জেলে ভরা যায়, তাকে তো ভরা হলই, পরিবারকেও পথে বসানোর ব্যবস্থা পাকা। আহা, কী ধন্য ধন্য রব।

সরকারপক্ষ বলতেই পারেন, আইনের অপব্যবহার হবে, এমনটা ধরে নেওয়া হচ্ছে কেন?‌ প্রশ্ন হল, হবে নাই বা কেন?‌ এর মধ্যেই বিরোধী শিবিরের কুড়ি জন এমপি–‌কে নিজেদের শিবিরে টেনে নিয়েছেন। পঁয়ষট্টি জন বিধায়ককে নিজেদের লেজুড় বানিয়ে ফেলেছেন। তাঁদের নামে যত অভিযোগ, সব কবরে পাঠানোর দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন। একমাসেই এই কঙ্কাল বেরিয়ে গেছে। তাঁদের ওপর বিশ্বাস রাখাও যা, আর পরের বিশ্বকাপ ফুটবলে ভারত চ্যাম্পিয়ন হবে, এই বিশ্বাস রাখাও প্রায় তাই।

বিজেপি নেতারাই তো গত পাঁচ বছর ধরে বলে আসছেন, তাঁদের হাজার হাজার কর্মীর নামে মিথ্যে মামলা দেওয়া হয়েছে। একই অভিযোগ বাম ও কংগ্রেস নেতাদের মুখেও শোনা যায়। এখন যিনি মুখ্যমন্ত্রী, তিনি যখন তৃণমূলে ছিলেন, তিনিও আইনকে নিজের মতো করেই ব্যবহার করেছেন, এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি। বিরোধীদের একের পর এক বিধায়ককে ভয় দেখিয়ে বা লোভ দেখিয়ে দলবদল করিয়েছেন। একের পর এক জেলা পরিষদ, পঞ্চায়েত সমিতি, পুরসভার সদস্যদের দলবদল করিয়েছেন। খুব সহজ পথে যে সেটা হয়নি, বলাই বাহুল্য। সুতরাং, আজ রামবাহিনীতে নাম লিখিয়েছেন বলেই তিনি বাল্মিকী হয়ে উঠেছেন, এতখানি আশাবাদী হতে মন সায় দেয় না।

তাছাড়া, গত কয়েক বছর ধরে এই যে গুন্ডামি, তার জন্য কি শুধু আগের সরকার দায়ী?‌ যাঁরা গুন্ডামির সঙ্গে যুক্ত, তাঁরাই তো গরু, কয়লা, বালি পাচারের ও চাকরি চুরিরও পান্ডা ছিলেন। কেন্দ্রীয় এজেন্সি তো বছরের পর বছর তদন্ত করছিল?‌ তারা কী অশ্বডিম্ব প্রসব করল?‌ কেন্দ্র যদি এই অর্বাচীনদের বাঁচানোর দায়িত্ব না নিত, এঁদের সাহস হত লাগামছাড়া গুন্ডামি করার?‌ এঁরা অনেক আগেই শ্রীঘরে পৌঁছে যেত। কবে রাজ্যে পালাবদল হবে, তার অপেক্ষা করতে হত না। পারবেন কেন্দ্রের এই ভূমিকাকে ধিক্কার জানাতে?‌ পারবেন সিবিআই, ইডির সেই অফিসারদের শাস্তির দাবি করতে? পারলে, বুঝতাম সত্যিই সাহসী। খামোখা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া বিরোধীদের দিকে হুঙ্কার ঝাড়ছেন কেন?‌ ‌মনে রাখবেন, বিরোধীদের হুঙ্কার দেওয়া কোনও শাসকের সাহসিকতার সূচক নয়। নিজের দলের গুন্ডামি আটকাতে পারলে, তবে বুঝব তিনি যথার্থই সাহসী। হুমায়ুন যে স্যাঁটা ভাঙার কথা বললেন, কদিন আগেই আপনার উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী একই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন। জেলে ভরতে বলছি না, নিদেনপক্ষে তাঁর এই মন্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে তাঁকে তিরষ্কার করতে পারবেন!‌ এই গুন্ডামিকে আটকানো কিন্তু অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

নতুন সরকারের দায়িত্ব নিয়ে নিশ্চিতভাবেই কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তার জন্য অবশ্যই প্রশংসা প্রাপ্য। কিন্তু পাশাপাশি এমন কিছু পদক্ষেপও নিচ্ছেন, যাকে এখন লোকে ধন্য ধন্য করছে ঠিকই, কিন্তু সময় গেলে বোঝা যাবে, গণতন্ত্রের বুকে এও ছিল নির্মম এক আঘাত। আগের জমানায় বিরোধী দলের কোনও কোনও সদস্যকে শাসকদলে আনা হত। এই জমানায় তো গোটা বিরোধী দলকেই পকেটে পুরে নেওয়া হল। কার্যত শাসকের ‘‌বি টিম’‌ বানিয়ে নেওয়া হল। এই রাজ্যে এমন নজির নেই। ভারতের অন্য কোনও রাজ্যেই এমন লজ্জাজনক নজির নেই। দেড় মাস আগেও যাঁরা তৃণমূলের সাংসদ ছিলেন, হঠাৎ করে দলনেত্রীর আনুগত্য ছেড়ে তাঁরা এনডিএ পন্থী হয়ে গেলেন। গণতন্ত্রের পক্ষে এটাও নিশ্চয় খুব উজ্জ্বল বিজ্ঞাপন নয়। এই ‘‌মহান কর্মকাণ্ড’‌ দিয়ে যে সরকারের যাত্রা শুরু, তারা আইনের অপব্যবহার করবেন না, এটা বিশ্বাস করা সত্যিই বড় কঠিন ব্যাপার।

বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তিনি বিরোধী বিধায়ককে হুমকি দিলেন, এটাই নাকি হুমায়ুন কবীরের শেষ ভাষণ। কোনও সন্দেহ নেই, হুমায়ুনের বক্তব্যে সাম্প্রদায়িক উস্কানি ছিল। একইরকম উস্কানি কি স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণেও ছিল না?‌ হুমায়ুনের নামে একটা মামলা হলে তাঁর নামে তো অন্তত হাজার খানেক এফআইআর হওয়ার কথা। বিধানসভার ভিতর বিজেপির একেকজন বিধায়ক যে ভাষায় কথা বলছেন, অতীতে বিধানসভা কখনই এতখানি কলঙ্কিত হয়নি। স্পিকার মশাই কার্যত নীরব দর্শক। বিরোধীদের নাহ্য সমালোচনাকে থামিয়ে দিতে তাঁর তৎপরতা দেখার মতো। আর শাসকদলের একের পর এক হুমকি ও সাম্প্রদায়িক আস্ফালন দেখেও স্পিকটি নট।

আচ্ছা, গুন্ডামি করার সুযোগ কাদের সামনে বেশি?‌ শাসকের নাকি বিরোধীর?‌ আবহমান কাল ধরে গুন্ডামির অভিযোগ তো শাসকের দিকেই বেশি ওঠে। তাহলে, খামোখা বিরোধীদের হুঙ্কার দিচ্ছেন কেন?‌ মুখ্যমন্ত্রী টেনে আনলেন ২০১৯ সালের এনআরসি ও সিএএ বিরোধী আন্দোলনের কথা। আগের শাসককে তীব্র আক্রমণ করলেন। পঞ্চাশে এসেই তিনি বোধহয় অ্যালজাইমার্সে আক্রান্ত। স্মৃতি বোধ হয় ফিকে হয়ে এসেছে। ২০১৯ সালে তিনি কোন দলে ছিলেন?‌ যে শাসককে আক্রমণ করলেন, তিনি নিজেই সেই শাসকের গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবিনেট মন্ত্রী ছিলেন। যে দুই জেলায় সবথেকে বেশি হিংসা ছড়িয়েছে বলে অভিযোগ, সেই মালদা ও মুর্শিদাবাদের দায়িত্বে কে ছিলেন?‌ এক্ষেত্রেও নিজের নামটা ভুলে যাচ্ছেন। কই, তখন তো তৃণমূলের বিরুদ্ধে কোনও গর্জন শোনা যায়নি। তাহলে এখন গর্জন করছেন কেন?‌ সেদিনের তৃণমূলের সমালোচনা করতে গেলে, সেদিন নিজের ভূমিকার জন্য আগে লজ্জিত হোন।

আসলে, মানুষের স্মৃতিশক্তি বড়ই ফিকে। সেই কারণেই কখনও হিন্দু–‌মুসলিম তাস খেলে, কখনও রামের ধুয়ো তুলে, কখনও হুঙ্কার দিয়ে সেই স্মৃতিকে আরও ফিকে করে দেওয়ার এই আয়োজন।

গুন্ডামি যদি আটকাতেই হয়, আগে নিজের দলকে সংযত করুন। শুরুতে বলেছিলেন, তৃণমূল থেকে আসা কাউকে নেওয়া হবে না। ভরসা হয়নি, তবে শুনে ভাল লেগেছিল। এক মাসের মধ্যেই কুড়ি জন সাংসদকে ঘুরপথে নিতে হল। আটকাতে পারলেন?‌ পঁয়ষট্টিজন বিরোধী বিধায়কের যাবতীয় অপকর্মকে চাপা দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হল। সাহসী আর হতে পারলেন কই?‌ এমপি, এমএলএ–‌দের যখন নিয়েছেন, তখন কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত সদস্যরাই বা কী দোষ করলেন?‌ তাঁদেরও গিলতে হবে। অর্থাৎ, নিজের হুঙ্কার নিজেকেই বেমালুম গিলতে হবে।

কাইফি আজমির লেখা একটা জনপ্রিয় গজল ছিল। তুম ইতনা যো মুসকুরা র‌্যাহেহো, ক্যা গম হ্যায় জিসকো ছুপা র‌্যাহে হো। বাংলা করলে দাঁড়ায়, এত যে হাসছো, কোন দুঃখকে আড়াল করতে চাইছো? নতুন মুখ্যমন্ত্রীকেও প্রশ্ন করাই যায়, ‘‌এত যে হুঙ্কার দিচ্ছেন, কী এমন ভয়, যাকে আড়াল করতে চাইছেন!‌’

Previous post বাঙালি আর পশ্চিমে যায় না
Next post বিধানবাবু ও একটি আটপৌরে সভা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *