সরল বিশ্বাস
ভোটের আবেগ সবাইকে সেভাবে তাড়া করে না। কেউ কেউ আছেন চাকরিসূত্রে অনেক দূরে থাকেন, কিন্তু ভোটের দিন ঠিক হাজির হয়ে যান। আবার উল্টোটাও আছে। কাছাকাছি থাকেন, চাইলেই দিতে পারতেন। কিন্তু ভোট দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না।
কিন্তু এবার ভোট পড়ল ৯২ শতাংশ। নিশ্চিতভাবেই এই অঙ্কটা চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতোই। এত ভোট পড়ার পেছনে যুক্তিটা কী? যে যার মত করে ব্যাখ্যা করবেন। অনেকে বলছেন, এটা এস আই আর এর এফেক্ট। এবার নাম উঠে গেলেও আগামী দিনের নাম বাদ যেতে পারে, এই আশঙ্কায় নাকি অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন। কথাটা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। প্রত্যেকেই নিজের নিজের বুথে এমন এমন মানুষকে ভোট দিতে দেখেছেন, যাঁদের হয়তো গত পনেরো বা কুড়ি বছরে ভোট দিতে দেখা যায়নি। এবার শুধু তাঁরাই আসেননি, পরিবারের লোকদেরও সঙ্গে করে এনেছেন।
পাশাপাশি অন্য একটা ব্যাখ্যাও আছে। ধরা যাক, কোনও একটি বুথের ভোটার সংখ্যা ৭০০। হয়তো ভোট পড়তো সাড়ে পাঁচশোর কাছাকাছি। অঙ্কের হিসেবে প্রায় ৮০ শতাংশ। অনেক মৃত ভোটারের নাম তালিকায় থেকে গিয়েছিল। অনেকের হয়তো বিয়ে হয়ে গেছে, তবু তালিকায় নাম থেকে গেছে। কিন্তু ভোট দিতেও আসেন না। অনেকে কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন। সেখানেও নাম উঠেছে। ফলে গ্রামের বাড়িতে আর আলাদা করে ভোট দিতে আসেন না।
এবার এস আই আর এর কারণে ধরা যাক সেই বুথ থেকে ১০০ জনের নাম বাদ পড়ল। অর্থাৎ ভোটার সংখ্যা দাঁড়ালো ৬০০র কাছাকাছি। এবারও ভোট পড়ল আগের মতই, অর্থাৎ সাড়ে পাঁচশোর কাছাকাছি। অর্থাৎ যাঁরা আগেরবার দিয়েছিলেন, এবারও তাঁরাই দিলেন। কিছু নতুন নাম ও হয়তো যুক্ত হয়েছে। কিন্তু শতাংশের হিসেবে ৯০ শতাংশ ছাপিয়ে গেল।
কোথাও কোথাও হয়তো মৃত মানুষেরা অশরীরী আত্মা হয়ে ভোট দিয়ে যেতেন। যাঁরা নেই, তাঁদের ভোট অনেক সময় পড়ে যেত। কারণ এই সমাজে সমাজসেবকের অভাব নেই। সচরাচর শাসকদলের কর্মীরাই এই সমাজ সেবকের ভূমিকা নিয়ে থাকেন। এটা শহুরে ভোটের ক্ষেত্রে যতটা সহজ, গ্রাম্য ভোটের ক্ষেত্রে ততটা নয়। কারণ, সেখানে সবাই সবাইকে চেনেন। আপনার নামে অন্য কেউ ভোট দিতে এলে অন্য দলের এজেন্টরা সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন। তাই মৃত ভোটারের ভোট কোথায় বেশি পড়েছে, এমন সমীক্ষা যদি করা যায়, তাহলে দেখা যাবে শহুরে মৃতদের মধ্যে ভোট দেওয়ার প্রবণতা বেশি। গ্রাম্য মৃতদের ভোট দেওয়ার অনেক ঝক্কি। কেউ না কেউ ঠিক চিনে ফেলে। তখন সেই সমাজ সেবকের কাজটা বড্ড কঠিন হয়ে যায়। তখন শুধু ফাঁকি দিলেই হয় না। একটু ভয়ও দেখাতে হয়। মোদ্দা কথা, সন্ত্রাসের আবহ না থাকলে গ্রামের দিকে মৃত মানুষের পক্ষে ভোট দেওয়া কার্যত অসম্ভব। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের নামে ভোট পড়েনি।
তাহলে মোদ্দা কথাটা কী দাঁড়ালো? যাঁরা ভোট দিচ্ছিলেন, তাঁরাই দিলেন। শুধু কিছু মৃত ও স্থানান্তরিত ভোটারের নাম বাদ পড়ল। আর তাতেই আশি শতাংশ থেকে বেড়ে নব্বই শতাংশ হয়ে গেল।
