স্বরূপ গোস্বামী
সহজ কাজকে অকারণে জটিল করতে নির্বাচন কমিশনের জুড়ি নেই। অবশ্য নির্বাচন কমিশনকে একা দোষ দিয়ে লাভ নেই। কেন্দ্রে যাঁরা বসে আছেন, তাঁরা সবসময়ই একটা যুদ্ধ–যুদ্ধ ভাব বজায় রাখতে চান। ব্যস, গোটা দেশ ওই নিয়ে মেতে থাক। যে যার মতো করে ঘৃণা ছড়িয়ে যাক। তাতে অনেক কিছু চাপা পড়ে যাবে।
গত কয়েক মাস ধরে একটাই আলোচনা, এসআইআর। নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন। বেশ ভাল কথা। ভোটার তালিকা সংশোধন হওয়াই উচিত, এ নিয়ে কোনও সংশয় বা দ্বিধা থাকার কথা নয়। কিন্তু তার জন্য গোটা দেশে এমন আতঙ্কের আবহ তৈরি করতে হবে কেন? কী কেন্দ্র, কী রাজ্য, দু’পক্ষই যেন ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়েছেন। জলঘোলা না করলে তাঁদের তৃপ্তিই হয় না।
ভোটার তালিকা সংশোধনের একটা বড় অংশ হল মৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া। যত নাম বাদ পড়বে, তার অন্তত সত্তর শতাংশ মৃত ভোটার। এই কাজটা করতে এত হই হট্টগোল করা কি সত্যিই জরুরি? একটু সদিচ্ছা থাকলে সাতদিনেই করে ফেলা যায়। এর জন্য কোনও আতঙ্ক ছড়ানোর দরকার নেই। এমনকী আমজনতা বুঝতেও পারবে না।
সত্তর ভাগ কাজ মসৃণভাবে হয়ে গেলে, বাকি তিরিশ ভাগ কাজ সময় নিয়ে, ধীরে সুস্থে করা যেত। যাঁরা কমিশনের মাথায় বসে আছেন, তাঁদের বুদ্ধি নেই, এমন তো হতে পারে না। তাঁরা অনেক বেশি বিচক্ষণ। কিন্তু তারপরেও সহজ কাজটা যখন জটিল করেন, তখন প্রশ্ন জাগে।
ধরা যাক, ২০২৪ সালে কারা মারা গিয়েছেন, এই তালিকা করতে চান। একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন, কত সহজে এটা করা যায়। জেলাশাসকদের শুধু বলা হোক, সাতদিনের মধ্যে আপনার জেলার তালিকা দিন। তিনি কী করবেন? সিএমওএইচ–কে ডেকে নির্দেশ দেবেন, জেলা হাসপাতাল, মহকুমা হাসপাতাল, ব্লক হাসপাতাল মিলিয়ে এক বছরে যাঁদের মৃত্যু হয়েছে, সেই তালিকা দিন। যে কোনও হাসপাতালের কাছেই এই তালিকা দেওয়া কোনও ব্যাপারই নয়। একদিনেই দেওয়া যায়। হয়তো এক ঘণ্টাতেও দেওয়া যায়। এরপর নার্সিংহোম। জেলার নার্সিংহোম গুলোর কাছেও নার্সিংহোমে মৃতদের তালিকা চাওয়া যায়। তাঁদেরও এই তালিকা দিতে একদিনের বেশি লাগার কথা নয়। শুধু হাসপাতাল ও নার্সিংহোম ধরলেই ষাট থেকে সত্তর শতাংশ নাম পাওয়া গেল।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, অনেকে তো বাড়িতেও মারা যান। ঠিক কথা। কিন্তু বাড়িতে মারা গেলেও কদিন পরে তাঁকে ডেথ সার্টিফিকেট নিতে হয়। কারা দেয়? পঞ্চায়েত বা পুরসভা। কার কার সার্টিফিকেট ইস্যু হল, তাদের কাছে লিস্ট থাকার কথা। এক ঘণ্টার নোটিশেই সেটা পাওয়া সম্ভব। জেলাশাসকের নেতৃত্বে একটা আলাদা সেল খোলা হলে তারা এক–দুদিনের মধ্যেই তালিকা তৈরি করে দিতে পারে।
যে পদ্ধতিতে ২০২৪ হল, সেই পদ্ধতিতেই ২০২৩, ২২, ২১ এর তালিকা তৈরি করা সম্ভব। মনে করুন কোভিডের কথা। তখন প্রতিদিন বিকেলে সরকার জানিয়ে দিত, সারা রাজ্যে কতজন ভর্তি হয়েছে, কতজনের টেস্ট হয়েছে, কতজন পজিটিভ, কতজনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ সরকার বিকেলের মধ্যে প্রতিদিনের আপডেট জানিয়ে দিত। অর্থাৎ, সরকার চাইলে এই কাজটা নিঃশব্দেই করা যায়। এত ঢাক পেটানোর দরকারই পড়ে না। এত বিএলও, এত বিএলএ কিছুই দরকার পড়ে না।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, যদি কোনও পুরসভা তালিকা না দিতে পারে বা ভুল তালিকা দেয়! তারও ব্যবস্থা আছে। যারা ডেথ সার্টিফিকেট তুলেছেন, তাঁরা ব্যাঙ্ক বা বিএলআর অফিসে জমা করেছেন। সেখান থেকেও আলাদা তালিকা চাওয়াই যায়। তারপর শুধু মিলিয়ে দেখা। ব্যাঙ্কের তালিকায় নাম আছে, অথচ পুরসভা বা পঞ্চায়েতের তালিকায় নেই। গরমিল সহজেই ধরা যায়। তবে সেটা পরের ধাপ। আগে যে তালিকা হাসপাতাল, পুরসভা, ব্যাঙ্ক থেকে উঠে এল, তার ভিত্তিতেই নব্বই শতাংশ বাদ চলে গেল। এর পরের ধাপে, যেখানে গরমিল আছে, সেগুলো নিয়ে বসা। এর জন্যও তিন দিনের বেশি লাগার কথা নয়। দু–একজন পুরপ্রধানকে একটা চিঠি পাঠানোই যথেষ্ট। এক দুজনকে কয়েকদিন জামাই আদর করলেই বাকিরাও সব সাবধান হয়ে যাবেন। যেখানে গরমিল থাকবে, এসপিকে বলা হোক, তদন্ত করে তিনদিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে। আর কেউ বেগড়বাই করতে পারবেন না।
সদিচ্ছা থাকলেই করা যায়। একটু বিচক্ষণতা থাকলেই করা যায়। আর এই কাজটা মসৃণভাবে করতে পারলে বাকি কাজগুলো পরের ধাপে আরও মসৃণভাবে করা সম্ভব।
প্রশ্নটা হল সদিচ্ছা আর শিক্ষা নিয়েই। শিক্ষা মানে নিছক ডিগ্রি নয়। প্রশাসন চালাতে গেলে ন্যূনতম কিছু প্রশাসনিক শিক্ষাদীক্ষা লাগে। জালি ডিগ্রি হয়তো জোগাড় করা যায়, কিন্তু তাতে শিক্ষার ঝুলি অপূর্ণই থেকে যায়। কী কেন্দ্র, কী রাজ্য, এই শিক্ষার বড়ই অভাব। মাথাগুলোকে দেখলেই সেটা আরও ভাল করে বোঝা যায়। চেয়ারকে অনেক সম্মান দেখানো হয়েছে। আকাট মূর্খদের এবার আকাট মূর্খ বলার সময় এসেছে।
