আকাশ চ্যাটার্জি
কবীর সুমনের সেই চেনা গানের লাইন, ‘আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই, কিচ্ছু করার নেই।’
বিশ্বাস করুন, পাহাড়ি গ্রাম রিনচেনপংয়ে গিয়ে ঠিক এই কথাগুলোই মনে পড়ছিল। গানটা পুরোটাই জানা। ফলে, তিনদিনের সফরে বেশ কয়েকবার গেয়েওছিলাম। সফরসঙ্গী বন্ধু একটুও বিরক্ত হয়নি। বরং বারবার শুনতে চাইছিল। গলার গুণে নয়, গানটার গুণে। আরও বেশি করে প্রকৃতির গুণে। আসলে, পাহাড় মনের মধ্যে অদ্ভুত এক উদারতা এনে দেয়। তখন বেসুরো গানকেও দিব্যি হজম করা যায়।
সত্যিই কোথাও যাওয়ার তাড়া ছিল না। কিছুই করার ছিল না। সব ব্যস্ততাকে পিছনে ফেলেই আশ্রয় নিয়েছিলাম পাহাড়ের কোলে। পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে কখনও কখনও মনে হয়, কোথাও না গেলেই বোধহয় সবচেয়ে ভাল হয়।
দার্জিলিং, গ্যাংটক, পেলিং—দর্শনীয় জায়গার তালিকা হাতে নিয়ে পাহাড়ে পৌঁছে আমরা ছুটতে থাকি। এই ভিউপয়েন্ট, ওই মঠ, আর একটু দূরে জলপ্রপাত—একটার পর একটা জায়গা টিক দিতে টিক দিতে কখন যে পাহাড়ের আসল সৌন্দর্যটাই হারিয়ে ফেলি, টেরও পাই না। রিনচেনপং সেই তাড়া থেকে মুক্তি দেয়। রিনচেনপং গ্রামটার কথা দু–একটা পত্রিকায় ইতি উতি পড়েছিলাম। তখনও ইউটিউবের এমন রমরমা হয়নি। তাই পড়েই মনে মনে একটা দৃশ্যকল্প সাজিয়ে ছিলাম। গিয়ে দেখলাম, যা ভেবেছিলাম, তার চেয়ে ঢের সুন্দর।
পশ্চিম সিকিমের এই ছোট্ট পাহাড়ি জনপদে পৌঁছে মনে হয়, এখানে কিছুই করার নেই। আর সেই ‘কিছুই না করা’-টাই যেন সবচেয়ে বড় কাজ। আমরা দুই বন্ধু গিয়েছিলাম বর্ষার সময়ে। এই বৃষ্টির সময়ে অনেকেই পাহাড়কে এড়িয়ে চলেন। টানা বৃষ্টি হলে ঘরবন্দি হয়েই কেটে যায়। কিন্তু ওই যে, আমাদের কোথাও যাওয়ার ছিল না। তাই, ঝুঁকি নিতেও দ্বিধা ছিল না। বর্ষায় রিনচেনপংয়ের রূপ আরও অন্যরকম। মেঘ এসে পাহাড়ের গায়ে বসে থাকে। কখনও চারপাশ একেবারে সাদা, কিছুই দেখা যায় না। আবার হঠাৎ মেঘ সরে গেলে দূরে পাহাড়ের শরীর দেখা যায়। বৃষ্টির ফোঁটা টিনের ছাদে টুপটাপ শব্দ করে। আর আপনি বসে আছেন ডাকবাংলোর বারান্দায়।
রিনচেনপংয়ের সেই পুরনো ফরেস্ট ডাকবাংলো যেন এই অলস সৌন্দর্যেরই অংশ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এই অঞ্চলে এসেছিলেন—তাঁর পদচিহ্নের স্মৃতি রিনচেনপংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। পাহাড়ে যত যাই, এই মানুষটার ওপর যেন শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়। এত বছর আগে, এই দুর্গম পাহাড়েও তিনি এসেছিলেন! আম বাঙালি এত বছর পরেও যার হদিশ জানে না, সেখানে এত বছর আগে তিনি এই জায়গার সন্ধান পেলেন কীভাবে? নিশ্চয় এখানে কোনও কবিতা বা গানও লিখেছেন। রবীন্দ্র জীবনীকাররা জানলেও জানতে পারেন।
তবে, ডাকবাংলোটি সত্যিই চমৎকার। অনেকটা খোলা জায়গা। আর সামনে লম্বা বারান্দা। এখানে হেলানো চেয়ারে বসে থাকার রোমাঞ্চই আলাদা। বারান্দায় বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃষ্টি দেখা যায়। কোনও বই পড়তে পারেন, চা খেতে পারেন, কিংবা কিছুই না করে শুধু মেঘের ওঠানামা দেখতে পারেন।
তবে ডাকবাংলোটি এখন পর্যটকদের জন্য নিয়মিত খোলা থাকে কি না, যাওয়ার আগে অবশ্যই স্থানীয় বন দফতরের সঙ্গে খোঁজ নিয়ে নেওয়া ভাল। আর যদি ডাকবাংলোয় থাকা না-ও হয়, মন খারাপ করার কিছু নেই। রিনচেনপংয়ে এখন বেশ কিছু সুন্দর হোমস্টে তৈরি হয়েছে। কাঠের ঘর, জানলার বাইরে পাহাড়, ঘরোয়া রান্না—আর সবচেয়ে বড় কথা, আতিথেয়তায় সেই পুরনো পাহাড়ি আন্তরিকতা। শহুরে হোটেলের ‘সার্ভিস’-এর সঙ্গে যার কোনও তুলনাই হয় না। সন্ধ্যায় হয়তো বাড়ির লোকের সঙ্গে গল্প জমবে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসবে গরম ভাত, ডাল, পাহাড়ি সবজি কিংবা স্থানীয় কোনও রান্নার গন্ধ।
রিনচেনপং যেতে হলে কলকাতা থেকে প্রথমে নিউ জলপাইগুড়ি। সেখান থেকে গাড়িতে সিকিমের দিকে। জোরথাং হয়ে রিনচেনপংয়ের রাস্তা ধরা যায়। দূরত্ব খুব বেশি নয়, কিন্তু পাহাড়ি রাস্তার সৌন্দর্যের জন্য সময় হাতে রাখা ভাল। শিলিগুড়ি থেকে গাড়িতে মোটামুটি চার–পাঁচ ঘণ্টার পথ।
ভোরে ঘুম ভাঙুক পাখির ডাকে। জানলা খুলে দেখুন, পাহাড়ের গায়ে আলো কীভাবে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। সকালের চা শেষ করে পায়ে হেঁটে বেরিয়ে পড়ুন। কোনও গন্তব্যের প্রয়োজন নেই। সরু রাস্তা ধরে হাঁটুন। দু’পাশের বাড়ি দেখুন। পাহাড়ি মানুষের দৈনন্দিন জীবন দেখুন। কোনও অচেনা পাখির ডাক শুনে থমকে দাঁড়ান। ইচ্ছে হলে কোনও বাড়িতে ঢুকেও পড়তে পারেন। এটুকু বলতে পারি, গৃহকর্তা বিরক্ত হবেন না। চা খেতে খেতে গল্প জুড়ে দিতেই পারেন। অনেকটা সেই তু মান ইয়া না মান, ম্যায় তেরা ম্যাহেমান–এর মতো।
বিকেলে আকাশ বদলাতে দেখুন। সন্ধে নামুক খুব ধীরে। পাহাড়ে সন্ধে আসলে যেন কেউ আলোটা একবারে নিভিয়ে দেয় না—আস্তে আস্তে রং বদলায়। তারপর অন্ধকার। রিনচেনপংয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়তো কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্যও নয়। সুমন দিয়ে শুরু করলাম। এবার নচিকেতায় আসাই যায়। মনে হবে, ‘যখন সময় থমকে দাঁড়ায়।’ এখানে কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। কোনও দর্শনীয় স্থান দেখতেই হবে না। কোনও ছবি তুলতেই হবে না। শুধু বসে থাকুন।
বৃষ্টি দেখুন। মেঘ দেখুন। পাখির ডাক শুনুন। নিজের সঙ্গে একটু কথা বলুন। সফরসঙ্গীর জীবনের কত অজানা কথা আপনি জানেন না। এই সুযোগে জেনে নিলে মন্দ কী! সবার বুকেই অনেক কথা জমে থাকে। পাহাড়ই পারে অনেক না বলা কথার স্রোতকে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিতে। সেই বহতা নদী আপন বেগে পাগলপারা হয়ে বয়ে যাক।
