সঞ্জুর ইনিংস যেন ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত

অজয় নন্দী

আগের বছর টি ২০ ঘরানায় তিনখানা সেঞ্চুরি করেছেন সঞ্জু স্যামসন। এই কৃতিত্ব আর কোনও ব্যাটসম্যানের নেই। কিন্তু তারপরেও দিনের পর দিন মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে। যত না ফর্মের কারণে, তার থেকেও বেশি টিম ম্যানেজম্যান্টের খামখেয়ালিপনার কারণে।

হঠাৎ, তাঁদের মনে হল, শুভমান গিলের সঙ্গে অভিষেক শর্মাকে পাঠালে কেমন হয়!‌ জুটিটা ফ্লপ করল। তখন মনে হল, এবার শুভমানকে বসানো যাক। এদিকে, তার কয়েক মাস আগেই তাঁকে ঘটা করে সহ অধিনায়ক করা হয়ে গেছে। অভিষেকের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হল ঈশান কিষাণকে।

এবার উলট পুরান। যে অভিষেককে ঘিরে বিশ্বকাপের আগে এত লাফালাফি, তাঁর ব্যাটেই রানের ক্ষরা। গ্রুপ লিগে চূড়ান্ত ব্যর্থ। অতএব, ভাবনায় বদল। এবার অভিষেকের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হল সঞ্জু স্যামসনকে। ইশানকে পাঠানো হল তিন নম্বরে।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ম্যাচ হেরে এমনিতেই খাদের কিনারে পৌঁছে গিয়েছিল ভারত। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে জেতা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনও রাস্তা ছিল না। আর সেই ম্যাচেই জ্বলে উঠল সঞ্জু স্যামসনের ব্যাট। সেঞ্চুরি হয়তো এল না। তিন রানের ফাঁক থেকে গেল। কিন্তু এই অপরাজিত ৯৭ রানের ইনিংসটা সেঞ্চুরির থেকে কম কী?‌

আসলে, দল যখন দল জিততে থাকে, তখন অনেক ত্রুটি কার্পেটের তলায় চলে যায়। আমরা জয়ের উল্লাস নিয়েই মেতে থাকি। কিন্তু কোনও কোনও দিন আসে, যেদিন কঙ্কালসার চেহারাটা বেরিয়ে পড়ে। সুপার এইটের প্রথম ম্যাচে এভাবেই নাস্তানাবুদ হতে হয়েছিল।

এই দলে প্রতিভার অভাব নেই। কিন্তু ধারাবাহিকতার বড্ড অভাব। সব ম্যাচে সবাই রান পাবে, এমনটা না হতেই পারে। আবার একই ম্যাচে সবাই রান পাবে, তেমনটাও হয় না। বিশেষ করে টি২০ ঘরানায় এই অনিশ্চয়তা আরও বেশি। কিন্তু যে দলে সাতজন ব্যাটার, সেই দলের দুজন বা তিনজন তো বড় রান পাবে!‌ এবার সেটাও যেন দেখা যাচ্ছে না। ভারত জিতছে ঠিকই, কিন্তু কোনও একজন ব্যাটারের ওপর ভর করে। বাকিদের তেমন ভূমিকা থাকছে না।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ম্যাচের কথাই ধরা যাক। সঞ্জু স্যামসনের এই ইনিংস সত্যিই মুগ্ধ করে দেওয়ার মতো। কিন্তু উল্টোদিকের ছবিটা মোটেই উজ্জ্বল নয়। অভিষেক শর্মা যথারীতি শুরুতেই ফিরে গেলেন। ঈশান কিষাণও নির্ভরতা দিতে পারলেন না। দশ ওভার যেতে না যেতেই ফিরে গেলেন অধিনায়ক সূর্যকুমারও। ভারত কিন্তু তখন মোটেই ভাল জায়গায় ছিল না। পরের দিকে ধস নামতেই পারত। এইসব ম্যাচে সবসময় একটা জুটি দরকার হয়। কিন্তু সঞ্জুর সঙ্গে এই তিন ব্যাটারের জুটি হল কই?‌ সঞ্জুর যথার্থ সঙ্গী যদি কেউ হয়ে থাকেন, তবে তিনি তিলক ভার্মা। চাপের মুহূর্তে ওই জুটিটা তৈরি না হলে ভারতের বদলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ হয়তো সেমিফাইনালে খেলত।

সঞ্জুর কাজটা বেশ কঠিনই ছিল। একদিকে স্কোরবোর্ড সচল রাখা, অন্যদিকে উইকেট ধরে রাখা। দুটোই সুন্দরভাবে সামলেছেন। ক্রিকেটীয় শটেই ভরসা রেখেছেন। বারবার জুটি তৈরির চেষ্টা করেছেন। কখনই দায়িত্বজ্ঞানহীন মনে হয়নি। জানেন, কখন হাত খুলতে হয়, কখন নিজেকে গুটিয়ে নিতে হয়। যখন তিলক ভার্মা এলেন, তখন সঞ্জু নিজেকে কিছুটা যেন গুটিয়ে নিলেন। তিলককে হাত খুলে মারার সুযোগ করে দিলেন। সেই সময় তিলক দ্রুত রান না তুললে ১৯৬ রান তোলাটা মোটেই সহজ হত না। হার্দিক বা শিবমও কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছেন। সবথেকে যেটা ভাল লাগল, সঞ্জু কিন্তু নিজের শতরানের চেষ্টাই করলেন না। ৯৭ রানে অপরাজিত। একটু বেশি স্ট্রাইক নিলেই অনায়াসে সেঞ্চুরি এসে যেত। এটা যে কত বড় আত্মত্যাগ, তা ম্যাচটা না দেখলে বোঝা যাবে না। একদিকে দায়িত্বশীল ইনিংস, অন্যদিকে দলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে শতরানের চেষ্টা না করা, সবমিলিয়ে সঞ্জু নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন। এই ৯৭ রানের ইনিংস যে অনেক সেঞ্চুরির থেকেও মূল্যবান।

Previous post জোট না হওয়ার পিছনে অঙ্ক অন্যরকম
Next post এত দেমাক কীসের কাঞ্চনজঙ্ঘার?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *