যেখানেই তিনি, সেখানেই গ্যালারির রঙ হলুদ

সোহম সেন

একেক শহরের নামে দল। অর্থাৎ, সেই দলের হয়ে চিৎকার করবেন সেই শহরের মানুষ। কিন্তু কোথায় বা কী?‌ সব বেড়াজাল যেন একাই ভেঙে দিয়েছেন মহেন্দ্র সিং ধোনি।

কলকাতা হোক বা দিল্লি, যেখানেই তিনি খেলতে যান, গ্যালারির রঙ হয়ে ওঠে হলুদ। ভাবা যায়, কলকাতার দর্শকেরা নাইট রাইডার্সের হয়ে গলা না ফাটিয়ে হলুদ জার্সি পরে এসে ‘‌ধোনি–‌ধোনি’‌ চিৎকার করে যাচ্ছেন!‌ টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছেন ১২ বছর আগে। একদিনের ক্রিকেটে শেষ খেলেছেন, তাও সাত বছর আগে। বয়স ৪৪ বছর।
কিন্তু এখনও তাঁকে ঠিক ‘‌প্রাক্তন’‌ বলা যাবে না। আইপিএলের আঙিনায় এখনও সবথেকে বেশি মাতামাতি যাঁকে ঘিরে, তিনি এম এস ধোনি।

তাঁর ঘরের মাঠ বলে কিছু নেই। যেখানে তিনি খেলতে যান, সেটাই তাঁর ঘরের মাঠ। সেখানেই গ্যালারির রঙ হয়ে ওঠে হলুদ। সবার গায়েই উঠে আসে সাত নম্বর জার্সি।
ধরা যাক, ইডেনে কলকাতা নাইট রাইডার্স বনাম চেন্নাই সুপার কিংসের ম্যাচ। অজিঙ্কা রাহানের নাম লেখা জার্সি পরে যত লোক মাঠে আসবেন, তার থেকে অনেক বেশি দর্শক আসবেন ধোনির নাম লেখা জার্সি পরে। নাইট শিবিরের কেউ চার বা ছয় মারলে গ্যালারি যত না উত্তাল হবে, ধোনি চার বা ছয় মারলে গ্যালারি অনেক বেশি উত্তাল হবে।

কিন্তু ধোনির নামে এই উন্মাদনা কেন?‌ কারণ, আর দশজনের থেকে তিনি অনেকটাই আলাদা। তাঁকে অহরহ নিজের ঢাক নিজেকে পেটাতে হয় না। তাঁকে প্রতিনিয়ত টুইটার বা ইনস্টাগ্রামে ভেসে থাকতে হয় না। সবসবময় হ্যাংলার মতো ছবি পোস্ট করে নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখতে হয় না। একটা ম্যাচে রান পেলেই প্রাক্তনদের উদ্দেশে কুৎসিত আক্রমণ করতে হয় না। তিনি জানেন, কীভাবে নিজেকে প্রচারের আলোর আড়ালে রাখতে হয়। তিনি নিঃশব্দে টেস্ট থেকে অবসর নিতে পারেন। তিনি নিঃশব্দে সাদা বলের ক্রিকেটের নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে পারেন। তাঁর কোনও ফেয়ারওয়েল ম্যাচ লাগে না। তাঁকে লম্বা চওড়া ভাষণও দিতে হয় না। তিনি মাসের পর মাস সেনা বাহিনির ব্যারাকে প্রশিক্ষণ নেন। কেউ জানতেও পারে না। অহরহ ছবি ছেড়ে সেটাকে ইভেন্ট বানাতে চান না।

গোটা গ্যালারি তাঁকে দেখার জন্য উন্মুখ। তাঁর জন্যই গ্যালারি রেঙে উঠেছে হলুদ রঙে। অথচ, তিনি কিনা ব্যাট করতে নামছেন সেই আট নম্বরে। কোনও ম্যাচে সুযোগ পাচ্ছেন এক ওভার। কোনও ম্যাচে এক বা দুই বল। অথচ, চাইলেই তিনি তিনে বা চারে আসতে পারতেন। ব্যাট হাতে ঝড় তুলতে পারতেন। সর্বোচ্চ রানের তালিকায় প্রথম তিন–‌চারের মধ্যেই থাকত তাঁর নাম। যদি একদিনের ক্রিকেটে সাত নম্বরে না নামতেন, নামের পাশে হয়ত তিরিশ খানা সেঞ্চুরি থাকত। কিন্তু হেলায় সেসব ছাড়তে পারেন। টেস্ট ছেড়েছেন সেই ২০১৪তে। আর যদি এক বছর খেলতেন, একশো টেস্টের মাইলস্টোনে পৌঁছে যেতেন। হাসতে হাসতে সেইসব প্রলোভনকে উপেক্ষা করতে পারেন।

এইসব ত্যাগের কথা রেকর্ড বইয়ে থাকে না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি দৌড়ে কোথাও একটা সেই মানুষটাকে এগিয়ে দেয়। তাই যাঁদের নামের পাশে একশো টেস্ট বা দশ হাজার রান আছে, দিনের শেষে সেই মানুষগুলোকেও কোথাও একটা ছোট মনে হয় এই মহামানবের কাছে।

কে বলল আইপিএলে আবেগ নেই?‌ অন্তত ধোনির মতো তারকাকে ঘিরে উন্মাদনা বারবার বুঝিয়ে দিয়েছে, আইপিএল যথার্থ গুণীর কদর করতে জানে। সে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে জানে। এবার ধোনি কটা ম্যাচ খেলবেন, জানি না। খেললেও কত নম্বরে ব্যাট করবেন, আদৌ ব্যাট করতে পাবেন কিনা, জানা নেই। তবু সব তরুণকে পিছনে ফেলে তিনিই যেন হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা।

Previous post সহজ কথা এত সহজে কী করে বলতেন!‌
Next post বেঙ্গল টাইমস। ই–‌ম্যাগাজিন। ১ এপ্রিল সংখ্যা।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *