অন্তরা চৌধুরি
ছোটবেলায় যখন রবি ঠাকুরের কবিতাটা পড়তাম-
নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।
ওগো, আজ তোরা যাস নে গো তোরা
যাসনে ঘরের বাহিরে’
– মনে মনে খুব ভয় হত। তখন চারিদিকে এতো কংক্রিটের জঙ্গল ছিল না। বাড়ির
সামনেই ছিল বিঘার পর বিঘা জুড়ে সবুজ ধান খেত। ঘরের জানলা দিয়েই দেখতে
পেতাম কীভাবে ধানের ওপর বাতাসের ঢেউ খেলে যায়! তখন গ্লোবাল ওয়ার্মিং এতটা ব্যাপক আকারে মানুষের মনে বাসা বাঁধেনি। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই বর্ষা হত।
এখনকার মতো বৃষ্টির জন্য হাপিত্যেশ করতে হতো না। জানলার সামনে একটা ছোট্ট ঘরে একা একাই রবি ঠাকুরের কবিতা পড়তাম, আর মাঝে মাঝে মাঠের দিকে তাকাতাম। দেখতাম, চাষিরা মাথায় একটা বেতের ঝুড়ির মতো টুপি পরে মহানন্দে চাষ করছে।

তখন যন্ত্রচালিত ট্রাক্টর ছিল না। হাল ধরেই চাষ হত। গরুগুলোকে তাড়াতাড়ি
হালচাষ করানোর জন্য ওরা মুখে অদ্ভুত একটা আওয়াজ করত। একদিকে প্রবল
বৃষ্টি, আর অন্যদিকে তেমনি বাজ পড়ত। নিজের মনের ভেতরেই কেমন যেন বিদ্রোহ করে উঠত। শুধু ভাবতাম, রবি ঠাকুর বারবার করে এদেরকে বাড়ির বাইরে যেতে নিষেধ করেছে, তাও যে এরা আজকে কেন মাঠে এল কে জানে! কেন যে ওরা রবি ঠাকুরের কথা শোনে না! কাউকে বলতে পারতাম না। শুধু নিজেই গুমরে মরতাম। মনে হত কবিতাটা তো ওদের বারণ করার জন্যই লেখা। এখন সেদিনের কথা ভাবলে হাসি পায়।
চারিদিকে বর্ষার জলে পরিপূর্ণ থাকত মাঠ ঘাট। গ্রাম থেকে কত বউ আসত ধান
লাগাতে। একগোছা ধান হাতে নিয়ে কী সুন্দর পরপর লাগিয়ে যেত একই লাইনে। আমার খুব ইচ্ছে হতো ধান লাগাতে। কিন্তু পেরেছি আর কই! আজও যখন রাস্তায় যেতে যেতে এমন দৃশ্য দেখি মনে হয় ছুটে যাই। কিন্তু যাব বললেই কি আর যাওয়া যায়?
বর্ষাকাল এলেই রবিঠাকুরের এই কবিতাটা মনে পড়ে, আর ছোটবেলার সেই নিষ্পাপ ভাবনার কথা মনে পড়ে আজও বড় আনন্দ হয়।
