স্বরূপ গোস্বামী
কাছ থেকে কখনই আপনাকে দেখিনি। কথা বলার তো প্রশ্নই নেই। তবু কেন জানি না, আপনাকে অচেনা মনে হয় না। খুব দূরের মানুষ বলেও মনে হয় না। তাই, আপনি কী ভাবছেন, কেন নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখছেন, অনেক দূর থেকেও অনুমান করতে পারি। যা হয়ত আপনার কাছের লোকেরাও অনেক সময় পারে না।
আপনি মঞ্চে। আর আমি থেকেছি লক্ষ জনতার মাঝে। কখনও দেখেছি টিভির খবরে, কখনও কাগজের ছবিতে, কখনও মনে মনে। প্রায় কুড়ি বছরের অভ্যেস। তাই এবারও ব্রিগেডে যাব। কেন জানি না, ওই জায়গাটায় গেলে মনে জোর পাই। মনে হয়, আমি একা নই। আমার মতো আরও লক্ষ লক্ষ মানুষ রয়েছেন, যাঁরা এই কঠিন সময়েও লাল পতাকাকে ভালবাসেন।

পাড়ায়, চায়ের দোকানে যখন সিডিকেট, তোলাবাজি, মারামারি, চোখরাঙানির গল্প শুনি, মনে হয়, ঠিক হয়েছে। যারা খাল কেটে কুমীর ডেকে এনেছে, তাদের এমন শিক্ষাই পাওয়া উচিত। যখন সিঙ্গুরে শিল্পের শবযাত্রার পর উৎসব হয়, তখন অবাক হই না। মনে হয়, এটাই তো হওয়ার ছিল। যখন কোনও এক ভাইপো গোটা রাজ্যকে চোখ রাঙায়, যখন জেলায় জেলায় কয়লা–বালি–গরু পাচারের রমরমা শুনি, মনে হয় যাকে আনলে যা হওয়ার, তাই তো হয়েছে। যখন মিডিয়ার কম্পমান দশা দেখি, তখন মনে পড়ে একসময় এঁরা কী দাপটটাই না দেখিয়েছে, এখন কত ভীত–সন্ত্রস্ত।
থাক সে সব কথা। অনেকদিন ধরেই শুনে আসছি, আপনার শরীর ভাল নেই। এখন আর পার্টি অফিসেও আসতে পারেন না। চোখেও ঠিকমতো দেখতে পান না। ফলে পড়াশোনাও ঠিকঠাক করতে পারেন না। এবার ব্রিগেডে কি আপনি আসবেন? এখনও পর্যন্ত মিডিয়ার যা খবর, তাতে আপনি নাকি আসছেন না। হয়ত চিকিৎসকদের বারণ আছে। আমি চিকিৎসাবিদ্যার কিছুই বুঝি না। তবু মনেপ্রাণে চাই, আপনি অন্তত একবার আসুন। পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও আসুন।
কেউ কেউ বলতে শুরু করে দিয়েছে, অসুস্থ বুদ্ধবাবুকে এনে ব্রিগেড ভরানোর চেষ্টা করছে সিপিএম। চিরকালই এসব অর্বাচীন ছিল। এখনও আছে। তাঁদের কথায় পাত্তা না দিলেও চলবে। ব্রিগেড হয়ত এমনিই ভরবে। কিন্তু কে না জানে ব্রিগেডে আসা জনতা যাঁকে সবথেকে বেশি দেখতে চায়, সেটা আপনি। ভাষণ দেওয়ার দরকার নেই। শুধু একবার লক্ষ লক্ষ জনতার দিকে হাত নাড়বেন।

লক্ষ লক্ষ মানুষের ওই যে গর্জন। তার মধ্যেই রয়ে গেছে কত অক্সিজেন, কত প্রাণশক্তি। জানি না, ডাক্তাররা কী চিকিৎসা করছেন। কিন্তু এটুকু হলফ করে বলতে পারি, ডাক্তারের একমাসের ওষুধ যতখানি কাজ করবে, ওই লক্ষ মানুষের কয়েক মিনিটের গর্জন তার থেকে অনেক বেশি কার্যকরী। লক্ষ লক্ষ মানুষ জানিয়ে দিতে চায়, এই কঠিন সময়েও তারা আপনার পাশে আছে। সেই গর্জন আরও একবার বুঝিয়ে দিতে চায়, সিঙ্গুরে আপনি কোনও ভুল করেননি। আপনার পথটাই ছিল সঠিক পথ। সেই পথেই বাংলা আবার হাঁটতে চায়।
আবার আপনি ফিরে যাবেন পাম অ্যাভিনিউয়ের ওই ছোট্ট বাড়িতে। ফিরে গিয়ে দেখবেন, আর হয়ত অক্সিজেন সিলিন্ডার দরকার হচ্ছে না। ‘এক ব্রিগেড অক্সিজেন’ আপনি সঙ্গে নিয়ে ফিরেছেন। কেউ কেউ ভুল বুঝলেও অধিকাংশ মানুষ আপনাকে ভুল বোঝেনি। সিঙ্গুরও একদিন ঠিক চিনতে পারবে, তাদের আসল বন্ধু কে। সারা বাংলা একদিন বুঝবে, সত্যিকারের প্রশাসক কাকে বলে। সেই পর্বটা ব্রিগেড থেকেই শুরু হোক।
আপনাকে আমাদের দেওয়ার কীই বা আছে! লক্ষ লক্ষ মানুষের গর্জন দিতে পারি। এক ব্রিগেড অক্সিজেন দিতে পারি। তাই প্লিজ, পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও আসুন।
