গড়াপেটার বিরুদ্ধে আই এফ এ কখনও কড়া শাস্তি দিয়েছে? গড়াপেটায় যুক্ত ক্লাবকে সাসপেন্ড করেছে? কোনও ফুটবলার কি গড়াপেটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন? কলকাতা ফুটবলে এমন ঘটনা বছর দশেক আগে ঘটেছিল। নিঃশব্দে পেরিয়ে গেল দশটা বছর। সেই প্রতিবাদের নায়ক কুমারেশ ভাওয়াল বেঙ্গল টাইমসের মুখোমুখি।।
প্রশ্ন: সেই প্রতিবাদের দশ বছর পেরিয়ে গেল, জানতেন?
কুমারেশ: ওইভাবে সাল–তারিখ তো মনে থাকে না। তবে গড়াপেটার বিরুদ্ধে সেই প্রতিবাদ আমার জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে, যেখানেই যাই, ওই প্রসঙ্গটা উঠে আসে। অনেকেই বিস্তারিত জানতে চায়। সেদিনই যেমন একজন মনে করিয়ে দিল, সেই প্রতিবাদের দশ বছর। পুরানো পেপার কাটিংগুলো ঘেঁটে দেখলাম, হ্যাঁ, সত্যি সত্যিই দশ বছর হয়ে গেল।
প্রশ্ন:কই, মিডিয়ায় হইচই তো দেখলাম না।
কুমারেশ: সেটা মিডিয়ার ব্যাপার। কে কোন বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করবে, কে নীরব থাকবে, সেটা একান্তই তাদের বিষয়। তাঁরা হয়ত মনে করেছেন, এটা অনেক পুরানো বিষয়। রোজ যখন গট আপ হচ্ছে, তখন সেটাই স্বাভাবিক নিয়ম। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের তেমন গুরুত্ব নেই।
প্রশ্ন: একটু ফ্ল্যাশব্যাকে চলুন। আপনিও তো সেই ইস্টার্ন রেল–পোর্ট ম্যাচে খেলেছিলেন। খেলার সময় বুঝতে পারেননি ?
কুমারেশ: শুরুতে কিছু বুঝতে পারিনি। একেবারে শেষপর্বে বেশ কিছু অসঙ্গতি দেখলাম। বিশেষ করে শেষদিকে পোর্ট যেভাবে দুটো গোল করল, কেউ প্রতিরোধ করল না, সেটা কেমন যেন অস্বভাবিক মনে হল। ম্যাচের পর সবাই ছুটে পালিয়ে গেল। সবকিছু দেখে বুঝতে পারলাম, এই ম্যাচের ফল বোধ হয় আগে থেকেই ঠিক হয়েছিল।
প্রশ্ন: সেটাই তো আপনার শেষ ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল?
কুমারেশ: হ্যাঁ, ওই ম্যাচটা খেলেই ফুটবলকে বিদায় জানাব, এমনটাই ভেবেছিলাম। টানা ছাব্বিশ বছর ময়দানে খেলার পর সেই বছরেই বিদায় নিতাম। কিন্তু শেষ ম্যাচটায় এমন কলঙ্কিত ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ব, ভাবতে পারিনি। মনে হল, এর একটা প্রতিবাদ দরকার।
প্রশ্ন: বাইরে থেকে অনেকেই গট আপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। কিন্তু যারা খেলেছে, তারা চুপচাপ থাকে। তাহলে খামোখা আপনি মুখ খুলতে গেলেন কেন ?
কুমারেশ: খেলোয়াড়রা চুপ করে থাকে বলেই তো কোনওদিন প্রমাণ করা যায় না। মনে হল, এই ট্রাডিশনটা ভাঙা দরকার। খেলোয়াড়দের ভেতর থেকেই প্রতিবাদটা আসা দরকার। যা ঝড়ঝাপটা আসে আসুক, ছাব্বিশ বছর খেলার পর আমার অন্তত চুপ করে থাকা মানায় না। তাই মনে হল, প্রতিবাদ করা দরকার।
প্রশ্ন: কেমন সাড়া পেয়েছিলেন ?
কুমারেশ : এতখানি সাড়া পাব, নিজেও কখনও ভাবিনি। ফেডারেশন প্রেসিডেন্ট থেকে আই এফ এ সচিব, সবাই অভিনন্দন জানালেন। প্রাক্তন ফুটবলাররাও পাশে ছিলেন। আই এফ এ তদন্ত কমিটি গড়ল। আমাকে ডাকা হল। সেখানে নিজের মতামত তুলে ধরলাম। কেউ কেউ আমাকেই জেরা করতে শুরু করলেন। বুঝতে পারলাম, তাঁরা চাইছেন না গড়াপেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু সেই সময় আই এফ এ সচিব সুব্রত দত্ত পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আই এফ এ শাস্তি দিতে পেরেছিল। সেই প্রতিবাদকে মর্যাদা দিয়েছিল।
প্রশ্ন: কখনও ভেবেছিলেন, শেষ ম্যাচটা মোহনবাগানের নেতৃত্ব দেবেন?
কুমারেশ: না, সত্যিই এমনটা ভাবিনি। আমি যেদিন প্রতিবাদ করলাম, সেদিন থেকেই মোহনবাগান সচিব অঞ্জন মিত্র পাশে ছিলেন। পরে একদিন শুনলাম, আমাকে নাকি মোহনবাগান সই করাতে চাইছে। সেখান থেকেই নাকি ফেয়ারওয়েল দিতে চায়। একজন ফুটবলারের জীবনে এটা বিরাট একটা সম্মান। আগে মোহনবাগানে চার বছর খেলেছি। কিন্তু এই জার্সিতে বিদায় নিতে পারব, তা ভাবিনি। লিগের শেষ ম্যাচ যুবভারতীতে, মহমেডানের বিরুদ্ধে। সেই ম্যাচে আমাকেই ক্যাপ্টেন করা হল। খেলা শুরুর আগে দেওয়া হল সংবর্ধনা। এটা আমার কাছে বিরাট এক স্বীকৃতি।
প্রশ্ন: আপনি প্রতিবাদ করলেন। কী লাভ হল? গড়াপেটা কি থেমে গেল?
কুমারেশ: গড়াপেটা দিব্যি চলছে। সবাই এর দার্শনিক প্রশ্রয়দাতা। মিডিয়াও সোচ্চার ভূমিকা নিতে পারছে না। আই এফ এ–ও নিষ্ক্রিয়। আর জেলা লিগে তো আরও ব্যাপকভাবে চলছে। ক্লাবস্তরে কোচিং করতে গিয়ে আমার নিজেরই কত খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে। গড়াপেটা আটকাতে চেয়েছি। দিকপাল প্রাক্তন ফুটবলার প্রশ্ন করেছেন, কুমারেশ কি ওখানে মঠ গড়বে?
প্রশ্ন: আর কেউ তো এগিয়ে আসছে না।
কুমারেশ: সেটাই তো দুঃখের। প্রতিবাদটা থেমে গেল কেন? সৎ মানুষ কি নেই? নিশ্চয় আছে। হয়ত ভাবছেন, প্রতিবাদ করলে কেউ পাশে দাঁড়াবে না। হয়ত কেরিয়ার শেষ হয়ে যাবে। হয়ত আর কোনও ক্লাব ডাকবে না। তাছাড়া, ফুটবলারদের মধ্যে শিক্ষা ও চেতনার কিছুটা অভাবও আছে। কর্মকর্তারাও বুঝে গেছেন, এই ফুটবলাররা প্রতিবাদ করতে পারবে না।
প্রশ্ন: এখন নাকি বাচ্চাদের নিয়ে কোচিং করছেন? বাচ্চারা আর যাই হোক গড়াপেটা খেলবে না, সেটাই কি কারণ?
কুমারেশ: ময়দানেও কোচিং চলছে। গত দু বছর সি এফ সি–র কোচিং করালাম। দায়িত্ব নেওয়ার আগে দ্বিধা ছিল। এরাও শেষমেষ গট আপ খেলবে না তো? শুরুর দিনেই জামশিদদা বলে দিয়েছিলেন, আমরা কোনও গট আপ খেলব না। তুমি নিশ্চিন্তে কোচিং করাও। কেউ তোমার কাজে নাক গলাবেন না। অনেক কষ্টের মধ্যেও তাঁরা দল চালাচ্ছেন। আর বাচ্চাদের কোচিংটা দেখতে দেখতে পাঁচ বছর হয়ে গেল। সোদপুর উদয়ন সঙ্ঘের মাঠে। একসঙ্গে একশোজন বাচ্চা মাঠে আসছে, ভাবতে পারেন? ক্লাবের পক্ষ থেকে যে সাহায্য পাচ্ছি, তার সত্যিই তুলনা হয় না। ওরা সত্যিকারের ফুটবলকে ভালবাসে। এলাকার সমস্ত বাচ্চাকে আমরা এক ছাতার তলায় আনতে পেরেছি। একটি দিনও কেউ কামাই করিনি। আমার সতীর্থ আরেক ফুটবলার পার্থসারথী দাস। সেও নিঃশব্দে যে কাজ করছে, ময়দানের অনেক কোচ ভাবতেও পারবেন না। আর আমার সোদপুর ক্লাবের কর্তাদের দেখে কলকাতা ময়দানের কর্তারা শিখুক কীভাবে ফুটবলকে ভালবাসতে হয়। লিখে রাখুন, এই নার্সারি কোচিংই একদিন সাপ্লাই লাইন হয়ে উঠবে।
