স্বরূপ গোস্বামী
বাংলায় সাহসী আত্মজীবনীর নাকি বড়ই অভাব। সবাই নিজেকে একটু রেখেঢেকেই রাখেন। অধিকাংশ কৃতী বাঙালি আত্মজীবনী লিখতে বসেন এমন সময়ে, যখন তিনি জীবনের পশ্চিম সীমান্তের দিকে। অস্তগামী সূর্যের মতো অস্তরাগের রক্তিম আভা ছড়িয়ে যাওয়াই দস্তুর। টুকরো কিছু অভিমান হয়তো উঁকি মারে, বাকিটুকু কৃতজ্ঞতার ফোয়ারা। বেলাশেষে কেই বা খামোখা বিতর্ক ডেকে আনতে চায়!
স্মৃতি তর্পণের ক্ষেত্রেও কক্ষপথটা বড়ই চেনা ছকে বাঁধা। তিনি কতটা মহান ছিলেন, তা বোঝাতে নানা ঘটনার উল্লেখ। নিরপেক্ষ, নির্মোহ বিশ্লেষণের থেকে দেবত্ব আরোপের পাল্লা অনেক বেশি ভারী। এবড়ো খেবড়ো উঠোনেও যেন সুদৃশ্য কার্পেট বিছিয়ে দেওয়া।
প্রবহমান গড্ডলিকার বৃত্ত ভেঙে একেবারেই অন্য ঘরানার এক স্মৃতি তর্পণ উপহার দিলেন গৌতম ভট্টাচার্য। খেলা ও বিনোদন জগতে বেশ কয়েক দশকের অতি চেনা নাম। মেলামেশার ক্যানভাসটা অনেক প্রসারিত। স্মৃতিচারণের আড়ালে রিফ্লেক্টেড গ্লোরি গায়ে মাখার বা ঘনিষ্ঠতা জাহিরের প্রবণতা নেই। তাঁর যা উচ্চতা, এসব দরকারও পড়ে না। যাঁকে দূর থেকে দেখা, সেখানে দূরত্বও হয়ে উঠেছে বাঙ্ময়। কথায় আছে, শুধু দেখলেই হয় না, দেখার চোখ লাগে। এই স্মৃতি তর্পণ শুধু খেলা আর বিনোদনের চৌহদ্দিতে আটকে নেই। সাতরঙা রামধনুর মতোই আলোর বিচ্ছুরণ। তালিকাটা যেমন লম্বা, বিষয় বৈচিত্র্যেও তেমনই অভিনব। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য থেকে বুদ্ধদেব গুহ। নিপাট বাঙালিয়ানা থেকে বেরিয়ে শ্রীদেবী থেকে শেন ওয়ার্ন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় থেকে চুনী গোস্বামী, আবার লতা মঙ্গেশকার থেকে ইরফান খান। পেলে–মারাদোনার অধ্যায় যতটা আকর্ষণীয়, ব্যক্তিগত পরিসরে থাকা মৌ রায়চৌধুরী বা নিজের পেশার ধীমান দত্ত, মানস চক্রবর্তী, পার্থ রুদ্রর অধ্যায়ও ততটাই যত্ন নিয়ে লেখা। যাঁর ক্ষেত্রে যেমন রঙের চশমা দরকার, তেমনটাই বেছে নিয়েছেন। নিজেকে বিচারকের আসনে বসিয়ে ভাল–মন্দর সীমারেখা টানার চেষ্টা নেই। সাদা–কালোর মাঝে যে ধূসর আলপথ, সেই পথ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে কখনও নিজেকেও কাঠগড়ায় তুলেছেন। অতীতে কার প্রতি মূল্যায়ন কেমন ছিল, কাকে বুঝতে কোথায় ভুল হয়েছিল, কোথায় ফাঁক থেকে গিয়েছিল, তাও অকপটে লিখতে দ্বিধা করেননি। সুনীল গাভাসকার, সুরজিৎ সেনগুপ্ত সম্পর্কে সীমাহীন মুগ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কেন চেপে রাখতে হয়েছিল, তাও লিখেছেন অকপটে।
কারও মৃত্যুর পর তাঁর এপিটাফ নতুন কিছু নয়। কয়েকদিন ধরেই চলে শোকের আবহ। স্মৃতির সরণি বেয়ে কেউ কেউ হেঁটে যান। কিন্তু এই বই মোটেই সেইসব এপিটাফের সংকলন নয়। এ যেন ড্রোন ক্যামেরার মতোই। অনেকটা উপর থেকে, অনেকটা পরিসরজুড়ে এর বিস্তার। তাৎক্ষণিক মূল্যায়নে অনেক ফাঁক থেকে যায়। কখনও কখনও সময়কে একটু আপন খেয়ালে বয়ে যেতে দিতে হয়। এই দূরত্বই আসলে এনে দেয় এক নির্মোহ দৃষ্টি। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের চেনা ছক ভেঙে একসময় এসেছিল ‘তারাদের শেষ তর্পণ’। বড়ই মনোজ্ঞ ছিল সেই উপস্থাপনা। হইচই থেকে চাইলেই দেখা যায়। মোবাইলের পরিসর থেকে এবার আরও বড় ক্যানভাসজুড়ে তা এল ছাপার হরফে। একেবারেই অন্য আঙ্গিকে। সেদিনের উপস্থাপক এবং এবারের লেখক একই মানুষ— গৌতম ভট্টাচার্য। আর চমৎকার এই বই উপহার দিল দীপ প্রকাশন।
প্রতি অধ্যায়ে এমন কিছু মণিমুক্তো ছড়িয়ে, যা উদ্ধৃতি হিসেবে জমজমাট। সে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর বুদ্ধদেব গুহর ডুয়েল নিয়েই হোক বা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অনুলিখনের অভিজ্ঞতাই হোক। কিন্তু এখানেও মস্ত দ্বিধা। কোনটা ছেড়ে কোনটা বাছবেন? ইউটিউবে যেমন রিলস আছে, তেমনই একেকটা অধ্যায়ের টুকরো টুকরো ব্লার্ব বইয়ের আকর্ষণকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে। আত্মজীবনীর ক্ষেত্রে একটু সাহসী স্বীকারোক্তি থাকলেই তকমা পড়ে যায় ‘বিস্ফোরক’। তর্পণের ক্ষেত্রে ‘বিস্ফোরক’ কথাটা বড়ই বেমানান। কিন্তু অনেক বিশ্লেষণের আড়ালে মাঝে মাঝেই যা উঁকি মারে, তা বিস্ফোরকের থেকে কম কী? তারকাদের এমনকিছু স্বীকারোক্তি, যা সেইসময় প্রকাশ হলে তুলকালাম পড়ে যেত। সন্ধেয় টিভি চ্যানেলে ‘চণ্ডীমণ্ডপ’ বসে যেত। এতদিন তা ‘অফ দ্য রেকর্ড’ এর আড়ালে লুকিয়ে ছিল। সে ছিল এক পেশাগত সংযম। কিন্তু সময়ের প্রবাহে একটা সময় আসে, যখন সেই পেশাদারিত্বের বর্ম শিথিল করতে হয়। কারণ, তখন সেই সযত্নে আগলে রাখা স্মৃতি সমকালের চাঞ্চল্যের ঊর্ধ্বে পৌঁছে যায়।
তাহাদের শেষ তর্পণ
গৌতম ভট্টাচার্য
দীপ প্রকাশন
৪০০ টাকা
***
