কলকাতা শহরে মেলার অভাব নেই। কখনও শিল্প মেলা, কখনও বস্ত্রমেলা। কখনও রথের মেলা, কখনও সবলা মেলা। এমন নানা নামে কত মেলা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিন্তু সব মেলাকে ছাপিয়ে যায় বইমেলা। এই উৎসবের কাছে সবাই যেন ম্লান।
নিন্দুকেরা বলেন, যত ভিড় খাবারের দোকানে। পাল্টা প্রশ্ন করাই যায়, সব মেলাতেই তো নানারকম খাবারের স্টল থাকে। তাহলে সেসব মেলায় গেলেই তো হয়ে যায়। বইমেলায় ভিড় করতে হয় কেন? অনেকেই বলবেন, এত লোক তো আসছেন, বই কজন কিনছেন? এমন প্রশ্ন তিরিশ বছর আগেও ছিল, দশ বছর আগেও ছিল, এখনও আছে, চিরকাল থাকবে। কিন্তু স্টলের বাইরে ওই যে লম্বা লাইন। বইয়ের ভারী ব্যাগ হাতে ওই যে বেরিয়ে আসছেন হাজার হাজার মানুষ। তাঁরা কারা? বাঙালির অনেক দুর্নাম থাকতে পারে। কিন্তু দেশে আর কোন জাতি বইকে নিয়ে এভাবে মেতে ওঠে! শুধু দেশে কেন, পৃথিবীতে আর কটা শহর বই নিয়ে এমন গর্ব করতে পারে!
যাত্রা শুরু হয়েছিল ৪৯ বছর আগে। রবীন্দ্র সদনের উল্টোদিকের মাঠ থেকে। মাঝে ময়দানে লম্বা ইনিংস। একবছর যুবভারতীর পর মিলনমেলা। সেখান থেকে এখন স্থায়ী ঠিকানা পেয়েছে করুণাময়ীর মেলা প্রাঙ্গণে। শুরুর দিকে সংশয় ছিল, বইয়ের জন্য মানুষ করুণাময়ী পর্যন্ত আসবেন তো! সব সংশয়ের মেঘ সরিয়ে জমজমাট করুণাময়ী। মেট্রো রেল এনেছে নতুন মাত্রা। হাওড়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এখন শহরতলির মানুষও নিশ্চিন্তে আসতে পারেন বইমেলায়।
এতরকম বইয়ের সম্ভার। পুরনো লেখকরা যেমন আছেন, তেমনই সাড়া ফেলেছেন নতুন লেখকরাও। গল্প, উপন্যাস যেমন আছে, তেমনই আছে একেবারে ভিন্নধারার বইও। সিনেমা, গান, খেলা, ভ্রমণ, জীবনী, ধর্ম, ইতিহাস, পুরাণ— কত বিচিত্র বিষয়ের সম্ভার। যাঁর যেটা আগ্রহ, তিনি সেটা নিচ্ছেন। একটা সময় ছিল, যখন বিয়েবাড়ি, উপনয়ন, জন্মদিনে মানুষ বই উপহার দিতেন। সেই নিয়মে কোথাও যেন ছেদ পড়েছে। স্মার্ট ফোন এসেছে, পড়ার অভ্যেস কমেছে, এটাকে অস্বীকার করা যায় না। তবু বইমেলাকে ঘিরে এই উন্মাদনা বুঝিয়ে দেয়, বই চিরন্তন। বইয়ের বিপণন ব্যবস্থাও অনেক আধুনিক হয়েছে। এখন ঘরে বসেই বই অর্ডার দেওয়া যায়। সামনেরবার বইমেলার পঞ্চাশ বছর। তার আগে বাঙালি আবার সেই হারানো অভ্যেস ফিরিয়ে আনুক। উপহার হিসেবে বই আবার স্বমহিমায় ফিরে আসুক।
