অবশেষে অনিশ্চয়তার মেঘ কাটল। টি২০ বিশ্বকাপে ভারত–পাক ম্যাচ নিয়ে আর কোনও সংশয় রইল না। দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বন্ধ। ভারত যেমন পাকিস্তান সফরে খেলতে যায় না, তেমনই পাকিস্তানও ভারতে আসে না। এমনকী বিশ্বকাপ বা এশিয়া কাপেও দুই দেশের লড়াই হয় নিরপেক্ষ মাঠে। কখনও কলম্বো, কখনও দুবাই।
যেমন, এবার টি২০ বিশ্বকাপের আয়োজক ভারত। কিন্তু পাকিস্তান আগেই জানিয়ে রেখেছিল, তারা ভারতে দল পাঠাবে না। সেই অনুযায়ী তাদের সব খেলা দেওয়া হয় শ্রীলঙ্কায়। গ্রুপ পর্বে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলতে ভারত উড়ে যাবে কলম্বোয়, এটাও ঠিক হয়েই ছিল। আচমকাই, পাক সরকার যেন জলঘোলা করতে নেমে পড়েছিল। তারা জানিয়েছিল, বিশ্বকাপের অন্যান্য ম্যাচে খেললেও ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে তারা খেলবে না। ভারত–পাক ম্যাচ না হওয়া মানে অর্ধেক আকর্ষণই হারিয়ে যাওয়া। এভাবেই চাপে ফেলার রাস্তা নিয়েছিল পাকিস্তান।
তার আগে জটিলতা তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশকে ঘিরে। আইপিএল থেকে মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার পর বাংলাদেশ কর্তারা গোঁ ধরে বসেছিলেন, ভারতে খেলতে যাব না। তাঁদের খেলাও শ্রীলঙ্কায় দিতে হবে। বলাই বাহুল্য, তাঁদের এই দাবি মানেনি আইসিসি। অন্যান্য দেশগুলিও রায় দিয়েছিল, বাংলাদেশকে ভারতে এসেই খেলতে হবে। এরপর বিশ্বকাপ থেকে নাম তুলে নেয় বাংলাদেশ। তাদের বদলি হিসেবে ঘোষণা হয় স্কটল্যান্ডের নাম।
বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর নামে জলঘোলা করতে চেয়েছিল পাকিস্তান। বিশ্বকাপের আয়োজনে বড়সড় ধাক্কা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সঠিক সময়ে আসরে নেমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করল আইসিসি। পাকিস্তানকে বুঝিয়ে দেওয়া হল, ভারতের বিরুদ্ধে না খেললে পরিণতি ভয়ঙ্কর হতে পারে। বড় আর্থিক জরিমানা যেমন হতে পারে, তেমনই নির্বাসনের মুখেও পড়তে হতে পারে। বাধ্য হয়েই সুর বদল।
প্রশ্ন হল, যে কোনও বড়সড় ইভেন্টের আগে মাঠের বাইরের ঘটনা এত প্রাধান্য পাচ্ছে কেন? খেলার মাঠ চিরকালই শান্তি ও সম্প্রীতির কথা বলে। এখানে রাজনীতির অনুপ্রবেশ না হওয়াই কাম্য। দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক যাই হোক, খেলার মাঠে তার প্রভাব না পড়াই বাঞ্ছনীয়। এমনকী কার্গিল যুদ্ধের পরেও পাকিস্তান সফরে যেতে দ্বিধা করেনি ভারতীয় ক্রিকেট দল। তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। টিম ইন্ডিয়া রওনা হওয়ার আগে অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিকে তিনি বলেছিলেন, ‘দিল ভি জিতকে আনা।’ সৌরভরা শুধু সিরিজ জেতেননি, পাকিস্তানের হৃদয় জিতে ফিরেছিলেন। আতিথেয়তায় পাক জনতাও কোনও ত্রুটি রাখেননি। সৌরভ–শচীনদের জন্য ছিল হৃদয় উজাড় করা ভালবাসা। আমাদের দেশের ক্রিকেট জনতাও ইমরান খান বা ওয়াসিম আক্রামদের প্রতি ভালবাসায় কোনও কোনও কার্পণ্য দেখায়নি। ক্রিকেট এভাবেই দুই দেশের মানুষকে আরও কাছাকাছি এনে দিয়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতির তিক্ততা বড় বেশি করে এসে পড়ছে ক্রিকেটে। আয়নার দিকে তাকালে মনে হবে, কিছু আত্মসমীক্ষাও জরুরি। মাঠে বিপক্ষের সঙ্গে হাত মেলাব না, পাক বোর্ডের কর্তা এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের মাথায় আছেন বলে তাঁর হাত থেকে এশিয়া কাপ নেব না, এগুলোও খুব সুস্থতার লক্ষণ নয়। এতে তিক্ততা আরও বাড়ে। পাশাপাশি, পাকিস্তান যেভাবে বয়কটের ডাক দিয়েছিল, এটাও কাম্য নয়। দোষারোপ, পাল্টা দোষারোপ ছেড়ে গড়ে উঠুক খেলোয়াড়সুলভ মনোভাব। মাঠের বাইরের তিক্ততা যেন মাঠের পরিবেশকে বিষিয়ে না তোলে, এটা দেখার দায়িত্ব দু’পক্ষেরই। খেলার মাঠে বিভাজন নয়, সম্প্রীতিই কাম্য।
