একটা দুশ্চিন্তাকে সঙ্গে নিয়েই গিয়েছিলাম পাহাড়ে। পৌঁছনোর পরেও সেই দুশ্চিন্তাই যেন তাড়া করছিল। সকালের ঝলমলে কাঞ্চনজঙ্ঘাই যেন সবকিছু বদলে দিল। ভরা বর্ষায় সে এমনভাবে দেখা দেবে, ভাবনারও অতীত ছিল। ওই হেম স্টেতে বসেই কিনা হয়ে গেল বহুজাতিক কোম্পানির দু’খানা ইন্টারভিউ। সবই কেমন যেন অবিশ্বাস্য লাগছে। পাহাড় সফরের অন্য এক উপাখ্যান। উঠে এল শান্তনু পাঁজার লেখায়।
কিছুদূর যাওয়ার পরই রাস্তার পাশে একটা ছবির মতো সুন্দর বাড়ি চোখে পড়ল। সামনে অজস্র ফুলে ঘেরা লন। সেখানে বসে এক বিদেশিনী আলতো রোদ গায়ে মেখে একমনে বই পড়ছেন। দৃশ্যটা মনে গেঁথে যাওয়ার মতোই। জায়গাটা একঝলক দেখেই বেশ ভাল লেগে গেল। জানা গেল, সেটা এক নেপালী পরিচালিত হোমস্টে। বাড়ির সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা। নানারকম পাহাড়ি ফুল বাগান আলো করে রেখেছে। অদ্ভুত প্রজাতির পাতাবাহার ও অর্কিডও রয়েছে। পাশেই রয়েছে বহু পুরনো বিশাল এক চার্চ।সিটং থেকে ফিরে লিখলেন অন্তরা চৌধুরি।
কাছাকাছি পায়ে হেঁটে গ্রাম ঘুরতে বেশ ভালো লাগল। সঙ্গে এবার বাপানও যোগ দিয়েছে। শান্ত, নিরিবিলি। মাঝে মাঝে ফেয়ারি টেলসের বাড়ির মতো রঙিন ছোট্ট ছোট্ট বাড়ি। শরতের মতো নীল আকাশ মাঝে মাঝে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। নানা রঙের প্রেয়ার ফ্ল্যাগ উড়ছে। রাস্তার দু’পাশে আপন খেয়ালে রংবেরংয়ের ফুল ফুটে আছে। কোনও যত্ন ছাড়াই বড় হচ্ছে তারা।
চা-বাগানের জন্য বিখ্যাত ‘পেশক’ থেকে কিছুটা উপরে উঠলেই মেঘের হাতছানি। সবুজ মখমলের মতো বনানী যেন আহ্বান জানাচ্ছে। যেতে যেতে প্রথমে সুন্দরী গোরীগাঁও। গোটা গ্রামে কুড়ি, পঁচিশটি ঘর। এখান থেকে দেখা যায় কালিংপং অার সিকিমের বিস্তৃত অঞ্চল। পরিষ্কার অাকাশ থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘাও দিব্যি দৃশ্যপটে এসে যায়।
সোনাদা থেকে চটকপুরের রাস্তাটা খুব খারাপ। কিন্তু আমাদের বেশ অ্যাডভেঞ্চারাস লাগছিল। একটা ঝকঝকে দিনে আমরা চটকপুর এসে পৌছলাম। আমাদের ড্রাইভার দাদাও বলছিলেন ‘আপলোগ ধূপ লে করকে আয়ে হো’৷ মাত্র আগের দিনই মেঘলা আকাশ ছিল। যেমনটা ভেবেছিলাম চটকপুর থেকে যে রূপে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখলাম সেটা ভাষায় প্রকাশ করার সাধ্যি নেই। এমনকী কোনও ছবিতেও বোঝানো যাবে না। ক্যামেরার লেন্সেরও সেই সাধ্য নেই। চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করলাম বিশাল শায়িত বুদ্ধ৷
এই যে হাতি, চিতাবাঘের মাঝে শুয়ে থাকেন, ভয় লাগে না? সাধুবাবা বলতেন, ওদের ভয় পেতে যাব কেন? ওরাও তো আমাকে ভয় পায় না। ওরাও দেখে আমি একা একা এখানে পড়ে থাকি। আমাক মেরে ওদের লাভ কী? ওরাও জানে, কারা ওদের ভালবাসে।
গত দু’আড়াই বছর ধরে বিজেপির এলাকাভিত্তিক সাংগঠনিক চেহারা মোটেই আশাপ্রদ নয়। অ্যান্টি এস্টাব্লিশমেন্ট ভোট পাওয়া এক জিনিস। আর সেই লোককে রাস্তায় নামানো আরেক জিনিস। এই ভোটটাকে কেউ কেউ সাংগঠনিক ভোট ধরে নিলেন। যেটা বাস্তবে নয়।
গত কয়েক বছরে পর্যটনে একটা নতুন দিক খুলে গেছে। সেটা হল, হোম স্টে। বেড়াতে যাওয়া মানে এখন আর শুধু হোটেল বা রিসর্টে থাকা নয়। পর্যটকরা স্বচ্ছন্দে হোম স্টেতেও থাকতে পারেন।...
সন্ধ্যে নামার ঠিক আগে পৌঁছে গেলাম কোলাখাম গ্রামে। এদিক ওদিক ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন হোমস্টে। তার মধ্যে ক্যাসিরো ইন, দ্য নেস্ট, স্টার হলিডেজ, দ্য ট্রেল্স এই হোমস্টে গুলো উল্লেখযোগ্য। হোমস্টে হিমালয়ান ওডেসির ব্যালকনি থেকে সামনের উপত্যকা চমৎকার দেখা যায়। ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে সামনের কাঞ্চনজঙ্ঘা কাল দেখা যাবে। এখানে বসে থাকলে মনে হয়, অলসভাবে সময় বয়ে যাক। মনে হয়, আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই, কিচ্ছু করার নেই।
আমাদের ঘরটা বেশ সুন্দর। ঘর লাগোয়া বারান্দা থেকে খুব ভাল ভিউ পাওয়া যায়। দূরের পাহাড়ে পেলিং শহর দেখা যায়। আর যেটা দেখা যায় সেটা হল সন্ধ্যেবেলা আকাশের তারাগুলো কীভাবে আলোর বিন্দুর সঙ্গে মিশে যায়। ১৮০ ডিগ্রি ভিউতে দেখা যাচ্ছে বিন্দু বিন্দু আলোয় ভর্তি পাহাড়ের সারি, এক কথায় অসামান্য। মনে হচ্ছিল, একঝাঁক তারা যেন কোন এক অমোঘ আকর্ষণে মাটিতে নেমে এসেছে।