আমার বেড়ে ওঠা আটের দশকে। স্বাভাবিকভাবেই পেলের খেলা দেখার সুযোগ হয়নি। ছোট থেকেই শুনে আসছি একটাই নাম, মারাদোনা। ছিয়াশির মারাদোনা ঠিক কেমন? সত্যি বলছি, তখনও বাড়িতে টিভি আসেনি। তাছাড়া, তখন শিশু মনে মারাদোনা নামটা সেভাবে দাগও কাটেনি।
মারাদোনা নামটা আরও বেশি করে শুনলাম তার কিছুটা পরে। কিন্তু তখন তো আর ইতালি লিগ দেখার সুযোগ ছিল না। ফলে, মারাদোনাকে ভালভাবে দেখা নব্বইয়ের বিশ্বকাপে। ফাইনালে গিয়েও চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি আর্জেন্টিনা। কোথায় লাতিন আমেরিকার একটা দেশ, তার জন্য কেন মন খারাপ হত, জানি না। পরের বিশ্বকাপে যা ঘটল, তার জন্য একেবারেই তৈরি ছিলাম না। আমার তখন ক্লাস ইলেভেন। মারাদোনা আগের ছন্দে নেই, এবার আর্জেন্টিনা বেশিদূর যেতে পারবে না, এটা মেনে নিতে মনে মনে তৈরিই ছিলাম। তবু লোকটার নাম তো মারাদোনা। যদি কোনও ম্যাজিক দেখিয়ে ফেলেন! কিন্তু সেই মারাদোনাকে কিনা নির্বাসনে পাঠানো হল!
তারপর থেকে বিশ্বকাপ দেখেছি ঠিকই, কিন্তু ভেতর তেকে সেই টান অনুভব করিনি। অন্য কোনও দলকে সমর্থন করিনি। কে জিতল, কে হারল, তেমন কোনও হেলদোল হত না। এমনকী, আর্জেন্টিনাকে ঘিরেও সেই উন্মাদনা আর ছিল না। সেটা ফিরে এল ২০১০ নাগাদ। মারাদোনা কোচ, তাঁর এক নম্বর অস্ত্র লিওনেল মেসি। স্বয়ং মারাদোনা কিনা বলছেন, মেসি আমার থেকেও বড় প্রতিভা। আবার প্রবলভাবে আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে পড়লাম। সেবার আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনানেই ছিটকে গেল। পরের বিশ্বকাপে ফাইনালে। অল্পের জন্য কাপ হাতছাড়া। মনে পড়ছিল নব্ব্ইয়ের সেই মারাদোনার কথা। দু’বছর পর সবাইকে অবাক করে মেসি কিনা অবসর নিয়ে বসলেন। খুব আঘাত পেয়েছিলাম। তখন কি সরে দাঁড়ানোর সময়! মেসির নামের পাশে একটা বিশ্বকাপ থাকবে না? আবার ফিরে এলেন। আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু। অবশেষে সেই স্বপ্নপূরণ কাতারে। মরুদেশে যেন মরুদ্যান হয়ে দেখা দিল আর্জেন্টিনা। মেসি ম্যাজিকে ধরা দিল বিশ্বকাপ। আর কী চাই?
এবার মেসির বয়স ৩৯। তবু মন থেকে চেয়েছিলাম, আর্জেন্টিনা জিতুক। রীতিমতো দাপট নিয়ে দলকে ফাইনালেও টেনে তুলল। কিন্তু আবার সেই স্বপ্নভঙ্গ। আসলে, আমাদের সব ইচ্ছে তো সবসময় পূরণ হয় না। নাই বা হল, মেসি যা দিয়ে গেলেন, তার কোনও তুলনা হবে না। পেলেকে দেখিনি, সেরা সময়ের মারাদোনাকেও দেখিনি। মেসিকে তো দেখেছি। আগামী প্রজন্মের কাছে গর্ব করে এটুকু তো বলতে পারব।
