বিজেপির ফাঁদে পা দেবেন না, উন্নয়নে মন দিন

সুগত রায়মজুমদার

১৯৭২ সালে সিদ্ধার্থ রায়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু ৫ বছরের বেশি টেকেনি সেই সরকার। কারণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। একই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের পরম্পরা তৃণমূলেও চলেছে। ভবিষ্যতে এটাই হয়ত পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
১৯৯৮ সালে কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি কংগ্রেসের সিপিএম–ঘেঁষা নীতি দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়ে তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেছিলেন। বড় মাপের নেতারা অনেকেই তখন আসেননি। মানুষ বামেদের বিকল্প খুঁজছিলেন। ক্রমশ তৃণমূলই হয়ে উঠল বামবিরোধী লড়াইয়ের মূলস্রোত। একে একে অনেকে সেই ছাতার তলাতেই আশ্রয় নিলেন। অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে মমতা ব্যানার্জি সুযোগের সদ্ব্যববহার করেছিলেন। সেই দলই এখন বাংলার মুখ। এখন এই দলের সাংগঠনিক শক্তি আকাশচুম্বি। পঞ্চায়েত থেকে পুরসভা, সর্বত্রই তাঁদের দাপট। তবে এই জনপ্রিয়তা ভাঙতেও বেশি সময় লাগে না। যা সিপিএম–কে দেখে শেখার ছিল। ২০০৬ সালে বিধানসভায় বামফ্রন্টের বিধায়ক সংখ্যা ছিল ২৩৫। এতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য গর্বিত হতেন। কখনও কখনও দম্ভও প্রকাশ পেত। আমরা ২৩৫, ওরা ৩০, এরকম আস্ফালনও শোনা গিয়েছে। মাত্র কয়েক বছরের মাধ্যে চালচিত্র আমূল বদলে যাবে, কে ভেবেছিল!‌

mamata
বিরোধী নেত্রী মমতা ব্যানার্জির উদ্দেশ্য ছিল সিপিএমের অচলায়তনকে ভাঙা। সেজন্য যে দলের বা গোষ্ঠীর সাহায্য প্রয়োজন, তা তিনি নিয়েছিলেন। এতেই তিনি সফল হয়েছিলেন। শুধু বিভিন্ন দলের সঙ্গে জোটগঠন নয়, সাধারণ মানুষের বিরাট অংশের মনেও যে রাগ–‌ক্ষোভ–‌ঘৃণা তৈরি হয়েছিল, সেই মানুষের সমর্থনও গিয়ে পড়েছিল তৃণমূলের বাক্সে।
শুধু সিঙ্গুর বা নন্দীগ্রাম নয়, জেলায় জেলায় দমবন্ধ করা আবহ তৈরি হয়েছিল। খুন, হামলা, হুমকির অভিযোগ উঠে আসছিল বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। শহরতলি এলাকায় চলছিল সিন্ডিকেট বাহিনীর জোরজুলুম। প্রত্যেক জেলার অঞ্চলে অঞ্চলে চলছিল কিছু দোর্দণ্ডপ্রতাপ অনিল বসু, লক্ষ্মণ শেঠ, সুশান্ত ঘোষ, তপন–সুকুরদের দের শাসন। তাঁরা ইচ্ছা করলেই বিরোধী দলের যে কোনও মানুষকে ভয় দেখানো থেকে শুরু করে কঙ্কাল বানিয়ে ছাড়তেও দ্বিধা করতেন না। শোনা যায়, যে কোনও স্তরের নির্বাচনের প্রাক্কালে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যেত সাদা থান কাপড়। ত্রাণ হিসেবে নয়, সুন্দর এক হুমকি হিসেবে। ছোট আঙারিয়া, নানুর, নন্দীগ্রাম, নেতাইয়ের গণহত্যা মানুষ ভুলতে পারেন না। এ ছাড়াও সিঙ্গুরের জমি টাটাকে দেওয়ার, তাপসী মালিকের রহস্যমৃত্যু, নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলি চালানো–‌এই ঘটনাগুলো দগদগে ঘা হয়ে থেকেই গেছে। সবমিলিয়েই ২০১১ বিধানসভায় মমতা ব্যানার্জি সফল হলেন জগদ্দল পাথরকে সরাতে। এই লড়াই নিয়ে ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবেই অন্য এক ইতিহাস লেখা হবে।
মমতা ব্যানার্জি ২০১১ সালে বাংলার মসনদে বসেন সাধারণ মানুষের অনেক আশা ভরসা নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, রাজ্যের কাউকে বাইরের দেশে এবং বাইরের রাজ্যে যেতে হবে না রোজগারের জন্য। তিনি এ রাজ্যে বিপুল কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন। যদিও এ ব্যাপারে অনেকটাই ব্যর্থ। অনেক কাজের ফিরিস্তি শোনা যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে তার তেমন মিল নেই। মমতা প্রথম ৫ বছর রাজ্যে রাস্তাঘাট, আলো, সৌন্দর্যায়ন–‌এসব ব্যাপারে অনেকটাই সফল। কিন্তু শিল্পে এ রাজ্যে তেমন বড় মাপের বিনিয়োগ আসছে না। কারণ তাঁর কর্মীরা। তাঁরা মমতার কথায় কর্ণপাত করছেন না। তাঁরা এলাকায় এলাকায় দাদাগিরি চালিয়েই যাচ্ছেন। অনেক নব্য তৃণমূল গজিয়ে উঠেছে। অধিকাংশই বাম শিবির থেকে আসা। তাঁরা আগে যেভাবে চোখ রাঙাতেন, এখনও তাই করছেন, শুধু গায়ের জামাটা বদলেছে। এতে তৃণমূলেরই ক্ষতি হচ্ছে। এইসব লোককে নিতে গিয়ে দলের পরিধি বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু ভাবমূর্তি ক্রমশ খারাপ হয়ে চলেছে। তার ওপর গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব তো আছেই। এতে যে সাধারণ মানু্্ষ আবার বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হবেন, তা তাদের বোধগম্য হচ্ছে না। মমতা কয়েকবার পারিষদবর্গ নিয়ে বিদেশ পাড়ি দিলেন শিল্পের আশায়। কিন্তু নিট ফল শূন্য। কারণ এ রাজ্যে শিল্পের পরিবেশ নেই সিন্ডিকেটের জন্য। এগুলি এখনই কঠোর হতে হবে। প্রশাসনকে আরও কার্যকরী ভূমিকা নিতে হবে।

mamata4
মমতা ভাল করেই জানেন এ রাজ্যে বেকারদের চাকরির সুব্যবস্থা করতে পারেননি। তাই তারা সিন্ডিকেট, দালালিতে নির্ভরশীল। ফলে বাড়ছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। ইমারতি ব্যবসা নিয়েও চলছে লড়াই। ফলে দিনদিন বাড়ছে খুনখারাবি, ডাকাতি। রাজ্যের সব জেলাতেই এটাই মানুষের প্রধান উপায় হয়ে চলেছে। কেউ প্রমোটারকে খুন করছে, কেউ করছে প্রমোটার–ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও নেতাদের। এ ছাড়াও বীরভূমে চলছে তাঁরই মদতে চলছে প্রশাসনের বিরুদ্ধে হুমকি। নেতাদের হুমকিতেই প্রশাসনিক অফিসাররা তটস্থ। প্রশাসন নিজেদের ইচ্ছেতে কাজ করতে পারছেন না। নেতাদের কথাতেই তাঁরা চলতে বাধ্য। না হলে চলবে নিগ্রহ। সবকিছু জেনেও মমতা ব্যানার্জি নিশ্চুপ। বিরোধী পরিসর ক্রমশ দখল করছে বিজেপি। একদিকে শাসকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, অন্যদিকে ধর্মের জিগির তোলা। কখনও কখনও মমতা ব্যানার্জিও বিজেপিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে ফেলছেন। মমতা ব্যানার্জির উচিত, বিজেপি–কে প্রাধান্য না দিয়ে উন্নয়ন দিয়েই এর জবাব দেওয়া। উন্নয়নই তাঁকে পুনর্বার ফিরিয়ে আনবে। তাঁকে মনে রাখতে হবে, তিনি কাজের মাধ্যমেই জনপ্রিয়। কাজই তাঁকে টিকিয়ে রেখেছে। উন্নয়নই তাঁর প্রধান অস্ত্র।
রাজ্যে মমতা ব্যানার্জি শাসনে না থাকলে তথাকথিত অনুরাগীরা অন্য দলে ভিড় করবেন সেই সুযোগ–সুবিধা নেওয়ার জন্য। এখনও সময় আছে, মমতা তাঁর পুরনো সঙ্গীদের ফিরিয়ে আনুন। দলে এসে তাঁরা মন দিয়ে কাজ করে যান। বিজেপি–কে গুরুত্ব দেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। আর রাজ্যে বেকার ইঞ্জিনিয়ার, উচ্চশিক্ষিত ছাত্রদের এবং সাধারণ মেধার ছাত্র–যুবদের কর্মসংস্থানের সত্বর ব্যবস্থা করুন। আর ধর্ম বিজেপি–র একচ্ছত্র ব্যাপার। তিনিও যেন এই প্রলোভনে পা না দিয়ে খুব শীঘ্রই মন্দির, মসজিদের খেলা থেকে বিরত হোন। মন্দিরের রাজনীতি থেকে দূরে থেকে, ধর্মের রাজনীতিকে অগ্রাহ্য করে উন্নয়নে ও কর্মসংস্থানে মন দিন। সাধারণ মানুষ এটাই চায়। যাঁরা আসল তৃণমূল কর্মী, তাঁরাও এটাই চান। অন্য রাজ্যে মন না দিয়ে, রাজনৈতিক ফয়দা নেওয়া থেকে বিরত থেকে নিজের রাজ্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিন।

Previous post পারিবারিক কেচ্ছা সামাল দিতে বিধানসভায় আইন বদলাতে হল!
Next post এমন দিনে কেউ বয়কট করে?‌

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *