সুনীপা দত্ত
লাটপাঞ্চার ঘুরে এলাম….. সেবক বাজার পেরিয়ে কালিঝোরা হয়ে বাঁ দিকের রাস্তাটাই হল লাটপাঞ্চার যাওয়ার রাস্তা। তিস্তার সরু একফালি জলের গতিকে পাশে নিয়ে গাড়ি পাহাড়ে উঠছিল। দেখতে পাচ্ছিলাম গভীর খাদ আর মোহময়ী তিস্তার নীল জল অপূর্ব এক সৌন্দর্যের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। মনের মধ্যে ভালোলাগার বুদবুদ গুলো কখন যে হাওয়ায় উড়তে শুরু করেছে খেয়াল নেই…গাড়ি চালাচ্ছিল লাল্টু খুব দক্ষতার সঙ্গে। বুঝলাম এ পথে ওর বেশ আনাগোনা আছে…পথের সৌন্দর্য নিতে নিতে দেড় ঘণ্টা সময়ের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম লাটপাঞ্চার। একটা ছবির দেশে পৌঁছে গেলাম মনে হল।
৪২০০ ফুট উচ্চতায় লাটপাঞ্চারের অবস্থান। বেশ হালকা ঠাণ্ডার আমেজ অনুভব করলাম। ওখানে পদম গুরুং এর হোম স্টে তে আগে থাকতেই থাকার জন্য বলা ছিল… তাই পরম নিশ্চিন্তে আস্তানায় ঢুকে গেলাম…. জন প্রতি খাওয়া থাকা নিয়ে ৯০০ টাকা ধার্য করছে হর্ন বিল হোম স্টে….. যাইহোক যে ঘরে থাকব বলে এলাম তার পরিবেশ মুগ্ধ করে দিল…. ঘরের সামনে বিশাল বারান্দা আর তারপরে শুধু পাহাড়ের হাতছানি। আর কোথাও যাবার মনে হলে প্রয়োজন নেই। এখানে বসেই পাহাড় আর অরণ্যের ভরপুর স্বাদ নিতে পারব। নিলামও তাই…. শুধু দুচোখ ভরে চেয়ে দেখা প্রকৃতির অকৃপণ অকৃত্রিম অসাধারণ রূপ…. না চাইতেই এত কিছু একসঙ্গে পাব ভাবতে পারিনি।
সন্ধ্যের পর যখন চাঁদের শোভা পাহাড়ের রেখাগুলোকে স্পষ্ট করে এঁকে দিল মনে হল আমি মানুষ নই…. কল্পলোকের রূপকথার পরি, এই স্বর্গীয় পরিবেশের একমাত্র দাবিদার….আকাশে মেঘেরও আনাগোনা দেখতে পাচ্ছিলাম…মন পাহাড়ের বৃষ্টিও চাইছিল। সে স্বাদটুকুও অপূর্ণ রইল না। পরের দিন আকাশে ঘন কালো মেঘের খেলা আর দূর থেকে ধেয়ে আসা বৃষ্টির শব্দ চেতনাকে উল্লসিত করে দিল…. বৃষ্টির ধারা নেমে এল পাহাড়ের বুকে…. সবুজ পাতার আরও সজীব আরও সবুজ হয়ে উঠল…. চোখের দৃষ্টি আবার ঝাপসা হয়ে গেল….ঈশ্বরের কাছে নতজানু হয়ে বললাম এ মনুষ্য জন্ম আমার বৃথা নয়…… বৃষ্টির পর ঠাণ্ডা আরও চেপে ধরল…. কনকনে হাওয়া বেশ কাবু করে দিল…. গরম জামা গায়ে চাপিয়ে গরম চা আর পকোরা বেশ এনার্জি এনে দিল…হঠাৎ চোখে পড়ল মেঘের ভিতর থেকে সাদা পাহাড়ের সারি…. প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না…. কিন্তু ক্রমশ স্পষ্ট হল কাঞ্চনজঙ্ঘার অনাবিল অভূতপূর্ব শোভা। দেখার শেষ নেই…. আর সে ইচ্ছেও নেই…এত আনন্দ একসঙ্গে পেলাম যে জীবনের সব গ্লানি মুহূর্তে ভুলে গেলাম…..এরপর চললাম জঙ্গলে….
লাটপাঞ্চার কথার অর্থ হল “বেতের বন”…. দেখলাম বেতের বন আর লাটপাঞ্চারের রাজা ধনেশকে(হর্নবিল)…তার সঙ্গিনীকে পরম যত্নে খাওয়াচ্ছে…দেখলাম লং টেল ব্রড বিলকে…. দেখে মনে হল মাথায় হেলমেট পরে আছে…. এত পাখি আর তাদের গুঞ্জন কানে আসছিল, মনে হচ্ছিল নেশা করেছি….যে আবেশে জড়িয়ে আছে মন তার থেকে বেরোতে চাই না আর….রাতের এই মায়াভরা পরিবেশ আর গরম গরম রুটি – তরকারি – মুরগির ঝোল আস্বাদনের তীব্রতাকে বাড়িয়ে দিল…. কম্বল জড়িয়ে কাচের জানলা দিয়ে রাতের পাহাড় দেখতে দেখতে কখন যেন চোখের পাতা বুজে গেল পরম তৃপ্তিতে……..



