বড় শরিককে দেখে শিখতে পারেন ছোট শরিকরা

রক্তিম মিত্র
মেজ, সেজো থেকে একেবারে ছোট। নানা শরিকের মুখেই শোনা যায় দাদাগিরির কথা। কার দাদাগিরি ? সরাসরি বলাই ভাল, সিপিএমের দাদাগিরি।
কিন্তু সিপিএম থেকে যা যা শেখার, তার কতটুকু শিখতে পেরেছেন এই শরিকরা ? এই কঠিন সময়েও আত্মঘাতী খেলাতেই মগ্ন রয়েছেন শরিকরা। প্রতিটি পদক্ষেপে প্রমাণ করছেন, শৃঙ্খলা-নীতি-আদর্শ সব ব্যাপারেই তারা সিপিএমের থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছেন।
সময়ের ঐতিহাসিক দাবি, জোট। সিপিএম খুব শখ করে জোট করেছে, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। যথেষ্ট ভাবনা চিন্তা করে, যথেষ্ট অঙ্ক কষেই এই জোট করা হয়েছে। আর এই জোটকে সফল করতে আন্তরিক চেষ্টাতেও ত্রুটি ছিল না। মনে রাখবেন, সবথেকে বেশি আত্মত্যাগ কিন্তু সিপিএমই করেছে।

শরিকদের চার-পাঁচটা আসন ছাড়তে হচ্ছে। তাতেই তাঁরা এমন কাঁদুনি গাইতে শুরু করেছেন, মনে হচ্ছে সবই বোধ হয় চলে গেল। সিপিএম-কে দেখুন। যেখানে নিশ্চিত জেতার সুযোগ, সেই আসনগুলিও কী অবলীলায় ছেড়ে দিয়েছে কংগ্রেসকে। তাঁদের ভেতরে কি প্রশ্ন ওঠেনি ? জেলা কমিটি, জোনাল কমিটি কি এত সহজে মেনে নিয়েছে ? দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ধরে বোঝানো হয়েছে। নিচুতলার কর্মীরাও বুঝছেন জোটের বাধ্যবাধকতা।
ছোট শরিকদের এসব কোনও প্রক্রিয়াই নেই। কোনটা ছাড়া হবে, কোনও হবে না, কোনও কোনও নেতা নিজেই ঠিক করে নিচ্ছেন। জেলা কমিটির সঙ্গে ন্যূনতম আলোচনাটুকুও হচ্ছে না। আর প্রার্থীবাছাই ? এমন এমন মানদন্ডে প্রার্থীবাছাই হয়েছে, যা শুনলে তৃণমূলও হয়ত লজ্জা পাবে।

cpm flag
কয়েকটা উদাহরণ তুলে ধরা যেতে পারে। পূর্ব মেদিনীপুরের এগরা। ডিএসপি প্রার্থী করল কাকে ? তৃণমূল থেকে আসা মামুদ হোসেনকে। যিনি আগেরবার জেলা পরিষদের সহকারি সভাধিপতি ছিলেন, এবারও তিনি জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ। না আছে লেখাপড়া, না আছে ন্যূনতম সততা। তৃণমূলের টিকিট না পেয়ে তিনি বিদ্রোহী হয়েছেন। আর তাঁকেই কিনা লুফে নিল ডি এস পি।
এই দলটা প্রবোধ সিনহার কথাতেই চলে। আগে তিনিই দাঁড়াতেন এগরা থেকে। আগের নির্বাচনে তিনি চলে গিয়েছিলেন পিংলায়। এবারও তিনি পিংলা থেকে প্রার্থী। কিন্তু এগরায় আর কো্নো প্রার্থী পাওয়া গেল না ? নিজেরা যদি প্রার্থী খুঁজে না পাচ্ছেন, তাহলে সিপিএম-কেই ছেড়ে দিতে পারতেন। এমনকি সিপিআইকেও ছাড়া যেত। তার বদলে তৃণমূল থেকে এরকম এক কলঙ্কিত প্রার্থীকে আমদানি করতে হল ? বোঝাই যাচ্ছে, মামুদ হোসেন নির্বাচনে সব খরচ নিজে করবেন। এমনকি পাশের কেন্দ্র পিংলারও হ্যত কিছু খরচ দেবেন। ভাবতে অবাক লাগছে, প্রবোধবাবুর মতো মানুষ এমন সিদ্ধান্ত নিলেন ? তাহলে রেজ্জাক মোল্লাকে নিয়ে তৃণমূল কী এমন ভুল করেছে ?
জোটে কোনও শরিকের সবথেকে ক্ষতি হলে, তা আর এস পি-র। কিন্তু আগে থেকে এই প্রস্তুতি নিলে সমস্যা এই আকার নিত না। এখানেও প্রার্থী বাছাইয়ে সেই সাবেকিয়ানা কাজ করেছে। কে কোথায় প্রার্থী হবেন, সিপিএমে প্রায় চার-পাঁচ মাস আগে আশি ভাগ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এমনকি জোট হলে কোনগুলো ছাড়তে হতে পারে, সেই প্রস্তুতিও অনেক আগে থেকে নেওয়া ছিল। বোঝাই যাচ্ছে, আর এস পি-র সেই প্রস্তুতিই ছিল না। মার্চ মাসেও অনেক কেন্দ্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। কংগ্রেসের সঙ্গে অনেক আগে থেকেই আলোচনা চালানো যেত। অধীরকে বুঝি বলতে পারলে, অনেকটাই সমাধানসূত্র বেরিয়ে আসত। কিন্তু শেষপর্যন্ত সব ঝুলিয়ে রাখা হল। কে কোথায় লড়বেন, কে সরে দাঁড়াবেন, তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা চলছে। অথচ, প্রথম দফার নির্বাচন আর মাত্র এক সপ্তাহ দূরে।

সবচেয়ে ডামাডোল অবস্থা সম্ভবত ফরওয়ার্ড ব্লকে। ভাবতে অবাক লাগে, এখানে প্রার্থীবাছাইয়ের জন্য রাজ্য স্তরে কোনও মিটিংই হয়নি। একজন নেতা একাই যা পেরেছেন, সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই জেলার সঙ্গেও আলোচনা করেনি। বিভিন্ন জায়গায় পেটোয়া কিছু লোককে টিকিট দেওয়া হয়েছে। একটি জেলায় জেলা কমিটির সব সদস্য চিঠি পাঠালেন। সবার দাবি, বিশেষ একজনকে প্রার্থী করা চলবে না। সেই নেতাই আর একটু হলে টিকিট পেয়ে যাচ্ছিলেন। অন্তত দুটি জায়গায় প্রার্থী ঘোষণার পরেও তা বদল করতে হয়েছে। এখানেও কে কত টাকা খরচ করতে পারবেন, সেটাই মানদন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলের নানা মহল থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ তো আছেই। এমনকি কোনও কোনও আসন বিরোধীদের সঙ্গে আঁতাত করে দুর্বল প্রার্থী দেওয়া হচ্ছে, এমনটাও শোনা যাচ্ছে। কন্ট্রাক্টর, প্রমোটারদের ধরে এনে প্রার্থী করে দেওয়া হয়েছে। নেতৃত্বের যা মতিগতি তাতে সেইসব অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়াও যাচ্ছে না।

cpm3

সিপিএম যখন বিভিন্ন জেলায় একঝাঁক নতুন মুখকে সামনে আনতে চাইছে, সেখানে অন্য শরিকদের তালিকায় নতুন মুখ দুরবীন দিয়ে খুঁজতে হবে। এমনকি স্থানীয় নেতৃত্বের মতামতকেও মূল্য দেওয়া হয়নি। কে গ্রহণযোগ্য, কাকে প্রার্থী করলে জেতা যাবে, সেটাও ভাবা হয়নি। প্রার্থী বাছাই হয়েছে কিছু লোকের মর্জিমাফিক। আর মূল মানদন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে, কে কত টাকা খরচ করতে পারবেন। দূর থেকে শুনলে অবিশ্বাস্য মনে হবে। কিন্তু এইসব দলের অন্দরে একটু কান পাতুন। তাহলেই বুঝতে পারবেন। এইভাবে যাঁরা প্রার্থী হচ্ছেন, তাঁরা যদি জিতেও যান, দলের সঙ্গে থাকবেন তো ? উন্নয়নের কর্মযজ্ঞে সামিল হয়ে যাবেন না তো ?
তখন সেই প্রার্থীদে্র লোভী, প্রতারক বলবেন না। টাকার মানদন্ডে যাঁরা ভোটে লড়ছেন, তাঁরা চলে যাবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কারা তাঁদের মনোনয়ন দিলেন, দয়া করে সেই নামগুলোও সেদিন মনে রাখবেন।

Previous post শুনুন ধর্মাবতার
Next post এক মঞ্চে সভা নয় কেন ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *