বাঙালির জীবনে মেরুকরণের অভাব ছিল না। রাজনীতি হোক বা খেলা, সিনেমা হোক বা গান— সব ব্যাপারেই বাঙালির মধ্যে ছিল আড়াআড়ি বিভাজন। কেউ বামে, তো কেউ ডানে। কেউ মোহনবাগান, তো কেউ ইস্টবেঙ্গল। কেউ উত্তম, কেউ সৌমিত্র। কেউ হেমন্ত, তো কেউ মান্না।
আটের দশকে আম–বাঙালির ঘরে একটু–একটু করে ঢুকে পড়ছে টিভি। বাঙালি যেন আরও বেশি করে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠছে। ফুটবলের আঙিনায় বাঙালি ছিল ব্রাজিলের অনুরাগী। ছবিটা আমূল পাল্টে গেল ছিয়াশি থেকে। বেঁটেখাটো একটি লোক বাঙালিকে আবার আড়াআড়ি বিভাজন করে দিল। একতরফা হলুদ ঝড় থামিয়ে মনের ভেতর জাঁকিয়ে বসল নীল–সাদা। বাঙালি ভালবাসল মারাদোনাকে, বাঙালি ভালবেসে ফেলল আর্জেন্টিনাকে।
এবার বইমেলার আঙিনাতেও ঢুকে পড়েছে সেই মারাদোনার দেশ। এবারের থিম আর্জেন্টিনা। যাই–যাই বিকেলে হাতের সামনে আর্জেন্টিনার প্যাভিলিয়ন দেখেই কেউ কেউ ঢুকে পড়ছেন। ভাবছেন, মারাদোনা বা মেসির দুষ্প্রাপ্য ছবি হয়তো পাওয়া যাবে। নিদেনপক্ষে তাঁদের নিয়ে দারুণ কিছু বই সাজানো থাকবে। কোথায় কী! কেউ কেউ বেজার মুখে বেরিয়ে আসছেন। আসলে, আর্জেন্টিনার সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক অন্তত একশো বছরের। ১৯২৪ নাগাদ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ গেলেন আর্জেন্টিনায়। বিশ্বকবির হাত ধরেই বাঙালির আপন হয়ে উঠলেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। তারপর থেকে ওকাম্পোকে নিয়ে বাংলায় কত বই, কত লেখাই না লেখা হল! অনেকে জোর গলায় বলে বেড়ান, ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী’ গানটা নাকি ওকাম্পোকে নিয়েই লেখা। ঘটনা হল, সেই গানটা মোটেই প্লাতা নদীর ধারে লেখা হয়নি। লেখা হয়েছিল শিলাইদহে, পদ্মার পাড়ে বসে। তাছাড়া, গানটা লেখা হয়েছিল ওকাম্পোর সঙ্গে কবির সাক্ষাতের প্রায় তিন দশক আগে, ১৮৯৫ সালে।
কোনও ইভেন্ট শুরুর আগে যেমন কাউন্টডাউন হয়, শেষের আগেও তেমনই এক বিষাদমাখা দিনগোনা। আর মাত্র একদিন! আগের দিন ছিল রবিবার। কাতারে কাতারে মানুষের ভিড় এসে আছড়ে পড়েছে করুণাময়ীর বইমেলা প্রাঙ্গণে। যতই মেট্রো থাক, যতই নানা রুটের বাস থাক, ফেরার সময় সবাইকেই বিস্তর ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়েছে। সোমবারের বইমেলায় ছিল তারই স্মৃতিচারণ। কে কীভাবে বাড়ি ফিরেছেন, সেই বীরত্বব্যঞ্জক উপাখ্যান। কিন্তু তার পরেও সোমবার আবার হাজির। বোঝা গেল, ভোগান্তির চেয়ে সুখস্মৃতির পাল্লা অনেক ভারী। গিল্ড কর্তা সুধাংশুশেখর দে পড়লেন বেশ বিড়ম্বনায়। ক্রমাগত দাবি আসছে, ‘দাদা, কাল এত ভিড়, স্টলে গিজগিজ করছিল। লোকজন ঢুকতেই পারেনি। সামনের বার প্লিজ একটু বড় জায়গা দেবেন!’ মঞ্চ থেকেই গিল্ড কর্তা বলে বসলেন, ‘কাল এমন ভিড় হবে, আমরা ভাবতেও পারিনি। এখন মনে হচ্ছে, এই মেলা প্রাঙ্গণটাও যেন ছোট হয়ে যাচ্ছে।’
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতেই স্টলের সামনে সেই চেনা ভিড়। কোথায় বিদায়বেলার করুণ সুর! বইমেলা যেন সেই চিরযৌবন নিয়েই ধরা দিল। ‘কুলীন’ স্টলে ভিড় থাকবে, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু তুলনায় অখ্যাত স্টলের সামনেও এঁকেবেঁকে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে লাইন। আশপাশের স্টলের কী বিড়ম্বনা! শুধু ইউটিউব ভিডিওর সৌজন্যে কোনও বইকে ঘিরে কী হাইপ উঠতে পারে, তার সাক্ষী থাকল বইমেলা। যাঁরা সেই বইয়ের কথা জানতেনও না, তাঁরাও লাইন দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বোঝা গেল, ‘নেতাজি’ জাঁকিয়ে বসেছেন। কেতাবের স্টলে উঁকি মারা একটি বইয়ের নামটা বেশ অভিনব— ‘যত সব ভাললাগালাগি।’ ছোটদের নিজস্ব ভুবন নিয়ে লিখেছেন সরসিজ সেনগুপ্ত। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে টানা ছয়দিন কাটিয়ে এসে লেখা গবেষণাধর্মী বই ‘রোহিঙ্গা শিবিরের অন্দরমহল’। দে’জ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত সাংবাদিক কৃষ্ণকুমার দাসের এবছরের দ্বিতীয় বই। সোমবার বইমেলায় সংবাদ প্রতিদিন স্টলে বইটির মোড়ক উন্মোচন করলেন প্রাক্তন সাংসদ ও লেখক সাংবাদিক কুণাল ঘোষ। এমন কত বই ছড়িয়ে–ছিটিয়ে উঁকি মারছে নানা স্টলে।
কলেজ স্ট্রিটে চালু একটা কথা, বইবাজারকে শাসন করেন মৃত লেখকরা। স্টলে স্টলে ঘুরলে সেটা আরও পরিষ্কার। কেউ চাইছেন সতীনাথ ভাদুড়ী, কেউ হেমেন্দ্রকুমার রায়। কারও হাতে তারাশঙ্কর, তো কারও ব্যাগে বনফুল। নতুন আঙ্গিকে, নতুন প্রচ্ছদে তাঁরা ঠিক হাজির। তাঁরা তো কবেই হারিয়ে গেছেন। কিন্তু কী অদ্ভুত ভাবে থেকে গেছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে চলেছে সেই সংক্রমণের ব্যাটন। বইমেলা যেন সেই ছবিটাই আরও একবার দেখিয়ে দেয়। পাশাপাশি, নতুন লেখকদেরও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কত নতুন লেখকের জন্ম হচ্ছে এই বইমেলায়। ফিকশনের বাইরে বেরিয়ে কত নতুন নতুন কনটেন্ট, যা কয়েক বছর আগে ভাবাও যেত না। সোশ্যাল মিডিয়ার দৈনন্দিন রোজনামচাও এসে যাচ্ছে দুই মলাটের ভেতর। লেখককে প্রকাশকের পেছনে ছুটতে হচ্ছে না, কার কেমন ‘ফলোয়ার’, সেটা বুঝে প্রকাশকই খুঁজে নিচ্ছেন লেখককে। এও তো নতুন এক ট্রেন্ড।
আসলে, বইমেলা মানেই বিবর্তনের নানা ছবি। সেই রবীন্দ্রসদনের উল্টোদিকের মাঠ হয়ে ময়দানে লম্বা ইনিংস। মাঝে যুবভারতী হয়ে মিলনমেলা। তারপর বইমেলা স্থায়ী ঠিকানা পেল করুণাময়ীতে। সামনের বছরই বইমেলা পা রাখছে পঞ্চাশ বছরে। কে বলল, মঙ্গলবার বইমেলার শেষ! বাঙালি সবসময়ই সময়ের থেকে এগিয়ে ভাবে। সে পঞ্চাশ বছর উদ্যাপনের প্রস্তুতি ঠিক শুরু করে দিয়েছে।
