ভারত থেকে যেনভারতই নির্বাসিত

স্বরূপ গোস্বামী

মনে পড়ে যাচ্ছে মৃদুল দাশগুপ্তর একটি বিখ্যাত ছড়া। ফুটবল আর ক্রিকেটের তুলনা টানতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘‌পৃথিবীর চারভাগে/‌তিনভাগ জল/ক্রিকেট তুচ্ছ খেলা,/‌খেলা ফুটবল।’‌

বিশ্বকাপ ফুটবলে যখন মাসের পর মাস ধরে চলে যোগ্যতা অর্জন পর্ব, সেখানে ক্রিকেটে হাতে গোনা কয়েকটি দেশ। বাকি দেশগুলিকে কুড়িয়ে–‌বাড়িয়ে জোগাড় করতে হয়। বিশেষ করে টি২০ বিশ্বকাপের সময় আরও বেশি করে সেটা বোঝা যায়। জোর করে কুড়িটি দেশকে খুঁজে বের করে চারটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। যেসব দেশকে নেওয়া হয়েছে, সেইসব দেশ যে ক্রিকেট খেলে, তাদের নিজেদের দেশের লোকেরাও হয়তো জানে না। প্রতিটি গ্রুপ থেকে উঠে আসবে দুটি করে দল। কোন কোন দল উঠে আসবে, আটটির মধ্যে সাতটি চোখ বন্ধ করে লিখে ফেলা যায়। বড়জোর চমক দিয়ে উঠে আসবে একটি অখ্যাত দল।

যেমন, ভারতের গ্রুপের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। বেশ কয়েক বছর ধরে, যে কোনও টুর্নামেন্টই হোক, ভারত আর পাকিস্তানকে এক গ্রুপে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। কোন যাদুমন্ত্র বলে এমনটা হচ্ছে, বলা মুশকিল। এশিয়া কাপে তো তিনবার দেখা হয়ে গেল। একবার গ্রুপ পর্বে, একবার সুপার ফোরে, একবার ফাইনালে। এবারের টি২০ বিশ্বকাপেও এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। যথারীতি, দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ এক গ্রুপে। বাকি দল গুলি কারা?‌ আমেরিকা, নামিবিয়া, হল্যান্ড। আচ্ছা, এই গ্রুপ থেকে কোন দুই দল পরের রাউন্ডে যাবে, সেটা বলার জন্য কি খুব বড় ক্রিকেটবোদ্ধা হতে হয়?‌ যেমন, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে এক গ্রুপে আছে আয়ারল্যান্ড, ওমান, জিম্বাবোয়ে। আগের জিম্বাবোয়ে হলে তবু না হয় কথা ছিল। কিন্তু এই জিম্বাবোয়ে অতীতের ছায়াও নয়। ফলে, প্রথম দুই দল নিয়ে কোনও সংশয়ের জায়গা নেই। ইংল্যান্ড, বাংলাদেশের সঙ্গে গ্রুপে আছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নেপাল, ইতালি। একমাত্র এই গ্রুপেই কিছুটা সংশয়। নেপাল বা ইতালি তেমন চ্যালেঞ্জার নয়। কিন্তু ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে একটি দলকে বিদায় নিতে হবে। পরের গ্রুপে দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, আফগানিস্তান, কানাডা, ইউএই। প্রথম দুই মোটামুটি নিশ্চিত। বড়জোর আফগানিস্তান কিছু চমক দিতে পারে।

ভারতের গ্রুপের কোন খেলাটি গুরুত্বপূর্ণ?‌ নিশ্চয় বলার অপেক্ষা রাখে না। ১৫ ফেব্রুয়ারির ভারত–‌পাক ম্যাচ। বেছে বেছে ওই ম্যাচ রবিবারে রাখা হয়েছে। এমনিতে ভারতের ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ। কিন্তু এই মেগা ম্যাচ কিনা খেলতে হবে কলম্বোয় গিয়ে। অর্থাৎ, বাকি দেশগুলো খেলবে ভারতেই। আর ভারতকেই কিনা আসল ম্যাচটা খেলতে হবে শ্রীলঙ্কায় উড়ে গিয়ে। অতীতে ভারত নানা বায়না ধরেছে। এখন তার উল্টো ফল ভুগতে হচ্ছে। পাকিস্তানে খেলতে যাব না, এমন গোঁয়ার্তুমি দেখাতে গিয়ে এখন নিজের দেশে বিশ্বকাপ, অথচ নিজেদেরই কিনা উড়ে যেতে হচ্ছে পড়শি দেশে। এমনকী পাকিস্তানের সঙ্গে যদি সেমিফাইনাল বা ফাইনালে খেলতে হয়, সেটাও খেলতে হবে শ্রীলঙ্কায় গিয়ে।

বিষয়টা শুধু আর পাকিস্তানের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নেই। এখন বাংলাদেশের সঙ্গেও সম্পর্কের সমীকরণ বেশ জটিল। বাংলাদেশও বায়না ধরেছে, যেখানে খুশি খেলতে রাজি, কিন্তু ভারতের মাটিতে খেলব না। তারা শ্রীলঙ্কায় খেলতে রাজি, দুবাইয়ে খেলতে রাজি, এমনকী পাকিস্তানেও খেলতে রাজি। কিন্তু ভারতে খেলতে রাজি নয়। যে ভারতের জন্য টেস্ট খেলার ছাড়পত্র এসেছে, ক্রিকেটীয় আঙিনায় যে ভারতের প্রতি বাংলাদেশ সবথেকে বেশি কৃতজ্ঞ ছিল, সেই ভারতে তারা খেলতে আসতে চাইছে না। সেই ভারতেই তারা কিনা নিরাপত্তার অভাব বোধ করছে। এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হল!‌

আসলে, এই বোর্ড নামেই স্বশাসিত, নিজস্ব কোনও সত্তা নেই। দিল্লির জো হুজুর গিরি করতে গিয়ে নিজেদের একেবারে লেজুড় বানিয়ে ফেলেছে। সরকারে সঙ্গে বোর্ডের সমন্বয় থাকবে, সেটাই কাম্য। কিন্তু কেন্দ্রের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডাকে নিজেদের অ্যাজেন্ডা বানিয়ে ফেলেছে এই বোর্ড। আইসিসি–‌তে পাঠানোর জন্য এই দেশ থেকে আর কাউকে পাওয়া গেল না। যিনি ক্রিকেট প্রশাসনের অ–‌আ–‌ক–‌খ টুকুও বোঝেন না, সেই জয় শাহ এখন আইসিসি প্রেসিডেন্ট। টাকার জোরে, বাবার পরিচিতি ও প্রভাবের জোরে ওই চেয়ারে হয়তো বসা যায়। কিন্তু কোনও যোগ্যতা ছাড়া ওই চেয়ারে বসতে গেলে, পদে পদে হাসির খোরাক হতে হয়। সেটাই হতে হচ্ছে।

আসলে, ভারতীয় বোর্ডের ছেলেমানুষি বায়নার বিরাম নেই। এশিয়া কাপের সময় বলা হল, আমরা পাকিস্তানের মাটিতে খেলব না। সেই বায়না মেনে, ভারতের খেলা দেওয়া হল মরুশহর দুবাইয়ে। ফাইনালে পাকিস্তানকে হারানোর পর এবার নতুন বায়না, আমরা ট্রফি নেব না। কারণ!‌ ট্রফি দেবেন এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতি, যিনি পাকিস্তানের লোক। আজব আবদার তো!‌ এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতি তো আর উগান্ডার লোক হবেন না। এতদিন ছিলেন অমিত শাহর পুত্র, তিনি আইসিসি–‌তে চলে যাওয়ার তার দায়িত্বে এখন পাক বোর্ড সভাপতি।

মহসিন নাকভি মঞ্চে দাঁড়িয়ে রইলেন। ভারতীয় ক্রিকেটাররা ট্রফি নিতে গেলেন না। প্রায় আধঘণ্টা ধরে চলল এই সার্কাস। আমাদের বোর্ডকর্তারা ভাবলেন, পাক কর্তাদের আচ্ছা বেইজ্জত করা গেছে। আসলে যে নিজেদেরই বেইজ্জত করলেন, এই বোধটুকুও নেই। খেলোয়াড়দের ফতোয়া দেওয়া হল, খেলার আগে বা পরে পাক ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাত মেলানো যাবে না। নিজেদের অসভ্যতা ক্রিকেটারদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে কেন?‌ এই অসভ্যতার নাম আর যাই হোক, দেশপ্রেম নয়। দেশপ্রেম এত সস্তা জিনিস নয় যে গন্ডমূর্খরা তা নিয়ে যা নিদান দেবেন, সেটাই সবাইকে মেনে চলতে হবে। এখানেই শেষ নয়, এবার অনূর্ধ্ব ১৯ এশিয়া কাপ। তাদের ওপরেও এল ফতোয়া, পাক ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাত মেলানো যাবে না। এমনকী, চ্যাম্পিয়ন হলেও ট্রফি নেওয়া যাবে না। চোদ্দ বছরের বৈভব সূর্যবংশীদেরও এঁরা ছাড়ছেন না। তাদের মাথাতেও দেশপ্রেমের নামে ‘‌বিষ’‌ ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নিজেদের অসভ্যতার অ্যাজেন্ডা এই খুদে ক্রিকেটারদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফাইনালে ভারতকে শোচনীয়ভাবে হারতে হল। বোর্ডকর্তারা হয়তো হাফ ছেড়ে বাঁচলেন, যাক, ট্রফি নিতে হল না। তাঁদের হয়তো এতেই আনন্দ। যেমন, অবোধের গো–‌বধেই আনন্দ।

এবার মুস্তাফিজুর কাণ্ড। আইপিএল এখনও ঢের দেরি। সত্যিই যদি মুস্তাফিজুরকে নিয়ে সমস্যা হত, পরে ভেবেচিন্তে কিছু একটা উপায় বের করা যেত। কিন্তু বোর্ডকে দেখাতেই হবে, তারা কেন্দ্রের ঘৃণা প্রচারের অ্যাজেন্ডা রূপায়ণে কতটা তৎপর। অতএব, তড়িঘড়ি মুস্তাফিজুরকে ছেঁটে ফেলার নির্দেশ। বাংলাদেশের বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ভারত সরকারের আতিথেয়তায় থাকতে পারেন, কিন্তু সে দেশের ক্রিকেটার খেলতে এলেই ভারতের আইপিএল নাকি অশুদ্ধ হয়ে যাবে। ফল কী হল!‌ এমনিতেই বাংলাদেশের একটি শক্তি ভারত বিরোধী প্রচার তুঙ্গে তুলে হাওয়া গরম করতে চাইছে, তাদের আরও উস্কে দেওয়া হল। এমনকী, বাংলাদেশের মধ্যে এখনও যাঁরা উদারমনস্ক, যাঁরা সম্প্রীতির কথা বলেন, এখনও যাঁরা ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞ, তাঁদেরও শত্রু শিবিরে পাঠিয়ে দেওয়া হল।

এই সুযোগটাই নিল বাংলাদেশ বোর্ড। তারাও বলতে শুরু করল, ‘‌ভারত একজন ক্রিকেটারকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, তারা গোটা দলকে কী করে নিরাপত্তা দেবে?‌’‌ ঠুনকো দেশপ্রেমের ঊর্ধ্বে উঠে যুক্তির নিরিখে দেখতে গেলে, একেবারেই সঠিক প্রশ্ন। ভারত যদি নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে বাংলাদেশে খেলতে না যায়, বাংলাদেশই বা আসবে কেন?‌ বেচারা আইসিসি!‌ এখন বাংলাদেশের কর্তাদের বোঝাতে সেই দেশে প্রতিনিধিদের পাঠাতে হচ্ছে। বোর্ডকর্তারা এখন নিশ্চয় হাত কামড়াচ্ছেন। তড়িঘড়ি করে মুস্তাফিজুরকে ছেঁটে ফেলার হঠকারিতা না দেখালে পরিস্থিতি হয়তো এতটা জটিল হত না। এভাবে নিজেদের ফেলা থুথু চাটতে অন্যের হাতে–‌পায়ে ধরতে হত না। ‘‌সর্বশক্তিমান’‌ ভারতীয় বোর্ডের কী অবস্থা!‌ বাংলাদেশও চমকাচ্ছে। কাদের নির্বুদ্ধিতায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হল!‌

সবমিলিয়ে টি২০ বিশ্বকাপকে অনর্থক জটিল করে তুলল ভারতীয় বোর্ড। বাংলাদেশ শেষমেশ কী সিদ্ধান্ত নেবে, এই লেখার সময় পর্যন্ত পরিষ্কার নয়। যদি সত্যিই বাংলাদেশ না খেলতে আসে, ভারতীয় বোর্ড ও অমিত শাহর পুত্র চালিত আইসিসি, উভয়েরই মুখ পুড়বে। তখন শুধু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নয়, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলতেও উড়ে যেতে হবে শ্রীলঙ্কায় বা অন্য কোনও দেশে। এ যেন ভারত থেকে খোদ ভারতই নির্বাসিত।

একবার ভেবে দেখুন, ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ। অন্য সব দেশ ভারতেই খেলবে। অথচ, ভারতকে কিনা খেলতে যেতে হবে অন্য দেশে। কী অভিনব ব্যাপার, তাই না!‌

Previous post ঢেউয়ের পর ঢেউ, উত্তাল বই–‌সমুদ্র
Next post কে বলল আজ বইমেলা শেষ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *