কলকাতার রাজপথে সাংবাদিক নিগ্রহের ঘটনায় আমি মর্মাহত। যাঁরা পুলিশের মারে আহত হয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমি সমবেদনা জানাচ্ছি। এই ঘটনায় যে সাংবাদিকরা উত্তেজনায় ফুটছেন তাঁদের আবেগকে সম্মান জানিয়ে কয়েকটি জিনিস ভেবে দেখতে অনুরোধ করব।
আমরা ক্ষুদ্র সাংবাদিকরা যারা রোদে-জলে পুড়ে দিবারাত্র কাজ করি, তাঁদের জীবনটা কি শুধুই সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার জন্যই নিবেদিত? কিন্তু এই স্বাধীনতা কি সত্যিই সাংবাদিকের? নাকি কয়েকজন অর্থ পিপাসু মালিকের মুনাফা সুনিশ্চিত করতে আমরা একটা অন্ধ মরিচিকার পিছনে ছুটছি?
কোন খবরটা ছাপা হবে, আর কোনটা হবে না, সেটা কে ঠিক করে দেয়? আমরা সব জানি। তবু না জানার ভান করছি। আমরা সাংবাদিকরা ভুখা পেটে রাস্তায় নেমে শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করব, আর মালিকরা সাংবাদিকতাকে বিসর্জন দিয়ে টাকার পাহাড় বানাবে, এই অনাচার যাঁরা মেনে নিচ্ছেন, তাঁরা পুলিশের মার খাওয়াটাও মেনে নিন।
আমরা কি কখনও খোঁজ নিয়ে দেখেছি, সাধারণ সাংবাদিকরা কীভাবে না মরে বেঁচে আছেন? কতজন সাংবাদিক প্রাথমিক স্কুলের একজন শিক্ষকের সমতুল বেতন পান? ৭০-৮০ ভাগ সংবাদকর্মী বড়বাজারের কুলিদের থেকে কম রোজগার করেন। মাসিক বেতন ৫-১০ হাজারের মধ্যে। জেলাতে হাজার টাকা মাইনের সাংবাদিকও রয়েছেন। রোজ গড়পড়তা ৮-১০ ঘণ্টা অফিসকে দিতে হয়। উপরি পাওনা বলতে মাঝে মধ্যে ফাইভ স্টার হোটেলে অনুষ্ঠান কভার করতে গিয়ে ভালমন্দ খাবার সুযোগ, নেতা-মন্ত্রীদের অফিসে ঢোকার ছাড়পত্র, পুজোর পাস, আর কোনও সময় ‘দাদা ফাটিয়ে দিয়েছেন” এই ধরনের বাহবা শুনেই সাংবাদিকরা বেমালুম ভুলে যান, সংসার চালানোর টাকা কোথা থেকে আসবে। ছেলের স্কুলের ফি-টা যে এখনও মেটানো হয়নি। বৃদ্ধ বাবাটার চশমার ফ্রেমটা ভেঙে পড়ে রয়েছে অনেক দিন হল। টাকার অভাবে স্ত্রীর ছোট্ট অপারেশনটাও করানো যাচ্ছে না। কিন্তু তাতে কী হল! সংসার চুলায় যাক। সাংবাদিকতার মহান দায়িত্ব আপনাকে পালন করে যেতে হবে।
কিন্তু কেন? কার জন্য? কীসের জন্য সাংবাদিকরা তাঁদের জীবনকে এভাবে বলিদান দেবেন? বাবা-মা, স্ত্রী-সন্ত্রানের প্রতি কি তাঁদের কোনও দায়িত্ব বোধ নেই?
আসলে যে পুলিশটা মারল, আর যে সাংবাদিকরা লাঠির ঘা খেল, আমরা সবাই দাবার বোড়ে। যত ঘাত- প্রতিঘাত তাদেরকেই সহ্য করতে হয়। নাটের গুরুরা ঠাণ্ডাঘরে বসে তখন ফিসফ্রাই খায়।
আক্রান্ত সাংবাদিকরা হয়তো মিছিল করতে পারবেন। কিন্তু তাতে আক্রমণকারীর গায়ে আঁচড় লাগবে না। লাঠিচার্জের বিহিত না হওয়া অবধি আমরা সাংবাদিকরা কি এক হয়ে পুলিশের সমস্ত অনুষ্ঠান বয়কট করতে পারব? এক কথায় উত্তর, পারব না।
কারণ, খবর ছাপা বা না ছাপার অধিকার সাংবাদিকদের নেই। সেই ক্ষমতা শুধুই মালিকের। তাহলে কেন আমরা খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে পুলিশের হাতে মার খাব? কেন আমরা মালিকের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য লড়াই করব?
বাংলা সাংবাদিকতার উত্তমকুমার প্রয়াত বরুণ সেনগুপ্ত বলতেন, খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে মার খাওয়াটা কোনও বীরত্বের কাজ নয়। নিজেকে বাঁচিয়ে যিনি খবর সংগ্রহ করে আনতে পারবেন তিনিই চতুর সাংবাদিক। এবার আপনারাই ঠিক করে নিন, কোন পথটা বেছে নেবেন। যুদ্ধ ক্ষেত্রে গিয়ে গোলার সামনে নিজের মুখটা বাড়িয়ে দেবেন, নাকি সুরক্ষিত বাঙ্কারে বসে খবর পাঠাবেন।
(কোনও এক সাংবাদিকের লেখা। সোসাল সাইট থেকে সংগৃহীত)

