স্বরূপ গোস্বামী
এক দশক আগেও লোকাল ট্রেনে একটি চেনা ছবি দেখা যেত। হকার বন্ধু হেঁকে যেতেন, ‘খবরের কাগজ। আনন্দবাজার, বর্তমান, আজকাল, প্রতিদিন..’ একেকজনের রুচি একেকরকম। কেউ নিতেন আনন্দবাজার, কেউ বর্তমান। কেউ আবার আজকাল বা প্রতিদিন। অন্তত অর্ধেক যাত্রী কোনও না কোনও কাগজ নিতেন। যাঁর আনন্দবাজারে চোখ বোলানো হয়ে গেল, তিনি পাশের যাত্রীর কাছে আজকাল চেয়ে নিলেন। যাঁর প্রতিদিন পড়া হয়ে গেল, তিনি হয়তো এবার বর্তমানটা চেয়ে নিলেন।
মাঝে মাঝে নানা টিকা–টীপ্পনি। কখনও রাজনীতিকে ঘিরে মৃদু তর্কও হয়ে যেত। মোদ্দা কথা, তিন ঘণ্টার যাত্রাপথে অন্তত দেড় ঘণ্টা কাটত খবরের কাগজের সঙ্গেই।
মাত্র কয়েক বছর আগের ঘটনা। অথচ, শুনলে মনে হবে যেন রূপকথার গল্পের মতো। মাত্র কয়েক বছরেই ছবিটা কেমন যেন বদলে গেল। এখন ট্রেনে উঠলেই যাত্রী কতক্ষণে ফোনটা বের করবেন, তার অপেক্ষা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখেছি, বসার দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যেই ফোন বেরিয়ে গেল। কেউ কেউ আবার গানে হেডফোন নিয়েই ট্রেনে উঠেছেন। তিনি ওইটুকু সময়ও নষ্ট করতে চান না।
কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছেন না। সবাই মোবাইল স্ক্রল করেই চলেছেন। কেউ তারস্বরে রিলস দেখে চলেছেন। আর সঙ্গে বাচ্চা থাকলে তো কথাই নেই। বাবা–মা ছেলের হাতে মোবাইলটা তুলে দিয়ে একেবারে নিশ্চিন্ত হয়ে নিজেরা মোবাইল ঘাঁটতে শুরু করেন। কেউ ফেসবুকে, তো কেউ ইউটিউবে। এখন আর ট্রেনে সেভাবে কাগজের হকার বন্ধুকে উঠতে দেখা যায় না। আর উঠলেই বা কী? ফোন থেকে মুখ তুলে তাকানোর ফুরসত কোথায়?
মাঝে মাঝেই শোনা যায়, এখন আর কাগজ পড়ে কী হবে? সব তো মোবাইলেই জানা যায়। সব কাগজ তো মোবাইল থেকেই পড়া যায়। ভাবখানা এমন, যেন কতই না পড়েন! কেউ কেউ নিশ্চয় পড়েন। কিন্তু তাঁরা সংখ্যায় বড়ই ক্ষীণ। এক শতাংশও হবে কিনা সন্দেহ। বাকিদের সঙ্গে কাগজের বা পড়াশোনার তেমন কোনও সম্পর্কই নেই। শেষ বই কবে পড়েছেন, একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন। স্পষ্ট কোনও উত্তর পাবেন না। যে বইটার নাম বলবেন, হয় ছেলেবেলায় পড়া। নইলে, না পড়েই বেমালুম একটা মিথ্যে বলে দিলেন। ফেসবুকে হয়তো প্রচ্ছদটা দেখেছেন।
কথা হচ্ছিল খবরের কাগজ নিয়ে। কাগজ নিয়ে চরম একটা তাচ্ছিল্যের সুর শোনা যায়। যেন, কাগজ পড়ার কোনও মানেই হয় না। কেউ বলবেন, সব কাগজ তো পা–চাটা। কেউ বলবেন, চটিচাটা। আসলে, তাঁরা বহুদিন কাগজের জগৎ থেকে বহুদূরে। কয়েকটা ইউটিউব ভিডিও–ই তাঁদের সম্বল। সগুলো দেখেন, আর ভেবে নেন, তিনি বোধ হয় দারুণ রাজনীতি সচেতন। একটু কথা বললেই বুঝতে পারবেন, কোনও কিছুই তাঁরা ঠিকঠাক জানেন না।
ব্যক্তিগতভাবে সমীক্ষা করে দেখেছি, এঁরা সারাজীবনে কোনওদিনই আনন্দবাজারের এডিটোরিয়াল পড়েননি। পোস্ট এডিট তো আলোকবর্ষ দূরে। কোনও একটি কাগজের একটা গোটা পাতা শেষ কবে পড়েছেন, নিজেরাও বলতে পারবেন না। একটি উত্তর ঠোঁটে লাগানোই আছে— ‘কাগজ পড়ার সময় কোথায়?’ যেন কতই না ব্যস্ত! এঁদের অন্তত আট থেকে দশ ঘণ্টা কাটে মোবাইলে। দশ মিনিট হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নিলে এমন ছটফট করবেন যেন ভেন্টিলেশনে থাকা রোগীর অক্সিজেন মাস্ক খুলে নেওয়া হয়েছে।
দোষটা শুধু এঁদের নয়। যাঁদের এরা ফলো করেন, তাঁদেরও পড়াশোনার বহর সত্যিই তারিফ করার মতো। তৃণমূল বা বিজেপি পন্থী হলে তো কথাই নেই। এই দুই দলের সঙ্গে শিক্ষার তেমন সম্পর্কই নেই। বামেদের মধ্যে যদিও বা পড়ার চল ছিল, কিন্তু ইদানীং তাঁরাও যেন প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়েছেন। এত বেশি ফেসবুক–আসক্ত হয়ে পড়েছেন, তাঁরাও ইদানীং মুখ তুলে তেমন তাকানোর সুযোগ পান না। ট্রেন হোক বা স্কুলের কমনরুম, ঘরোয়া আসর হোক বা পার্টি অফিস— তাঁদেরও চোখ সেই মোবাইলেই। অসহিষ্ণুতায় তাঁরাও পিছিয়ে নেই। কেউ একটু ভিন্নসুরে কথা বললেই রে–রে করে তেড়ে যাওয়ায় তাঁরাও কম যান না। ভিন্ন দল সম্পর্কে তেমন রাগ নেই, কিন্তু নিজেদের লোক যদি বেসুরো বলেন, তাহলে মাত্রা যেন আরও বেড়ে যায়। অধিকাংশেরই টানা তিনটে বাক্য শোনার মতো ধৈর্যটুকুও নেই।
এই অসহিষ্ণুতা আসে লাগাতার মোবাইল ঘাঁটা থেকেই। এই অসহিষ্ণুতা আসে পড়া থেকে বহুদূরে সরে গেলেই। তাই যাঁরা বলেন, কাগজ পড়ার সময় নেই, তাঁদের প্রতি কিছুটা করুণাই হয়। তাঁরা যে কোথায় তলিয়ে যাচ্ছেন, তাঁরা নিজেরাও জানেন না। খুব ইচ্ছে করে তাঁদের বলি, ও হে মশাই, কাগজ পড়তে সময় লাগে না, যোগ্যতা লাগে, যা আপনার নেই।
