ঠিক ষোল বছর আগের কথা। সেবার বিশ্বকাপের আসর বসেছিল নেলসন ম্যান্ডেলার দেশে। ফুটবলের আঙিনায় দক্ষিণ আফ্রিকা তেমন সাড়া জাগানো নাম নয়। মূলত নেলসন ম্যান্ডেলাকে সম্মান জানাতেই বেছে নেওয়া হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকাকে। উদ্বোধনী মঞ্চে সাকিরা গেয়ে উঠলেন, ‘ওয়াকা ওয়াকা ইটস টাইম ফর আফ্রিকা’।
২০১০ এর আগে এবং পরে, এত এত বিশ্বকাপ হল। এত এত থিম সং তৈরি হল। অথচ, এত বছর পরেও থিম সং বললে এই গানটাই সবার মনে ভেসে ওঠে। ‘উদ্দাম সে আদিম যুগে’র আফ্রিকা যেন বিবর্তনের অনেক পথ পেরিয়ে বিশ্বকাপের মতো মহাযজ্ঞের আয়োজক। তখনও পর্যন্ত আফ্রিকার দেশগুলির দৌড় মূলত শেষ হয়ে যেত প্রথম রাউন্ডেই। বড়জোর সেনেগাল, ক্যামেরুন, ঘানার মতো দেশের বিক্ষিপ্ত কিছু চমক। কিন্তু সেই চমকও থেমে যেত কোয়ার্টার ফাইনালে এসেই। সাফল্যগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই দেখেছিল ফুটবল বিশ্ব।
কিন্তু এবার যেন সত্যি সত্যিই চমক। একসঙ্গে দশটি দেশ কিনা উঠে এল বিশ্বকাপের আঙিনায়! নয়টি দশ উঠে এল সরাসরি। প্লেঅফ থেকে উঠে এল কঙ্গো। নাইজেরিয়া, ক্যামেরুনের মতো দেশের কিনা জায়গাই হল না!
হারাধনের দশটি ছেলে দিয়ে যাত্রা শুরু। অনেকে ভেবেছিলেন, হারাধনের সেই দশটি ছেলে যেমন একে একে ভ্যানিস হয়ে গিয়েছিলেন, আফ্রিকার এই দেশগুলিও তেমনই একে একে পাততাড়ি গোটাবে। নকআউট রাউন্ডে বড়জোর ‘রইল বাকি দুই’ বা ‘রইল বাকি এক’ গুনতে হবে। সত্যিই চমক কাকে বলে দেখিয়ে দিল আফ্রিকা। দশটি দেশের মধ্যে নয়টি কিনা উঠে এল নকআউটে! একমাত্র হতভাগ্য দেশ তিউনিশিয়া।
ইওরোপ, আমেরিকার ঐতিহ্যশালী দেশগুলি যখন প্রথম রাউন্ডেই মুখ থুবড়ে পড়ছে, সেখানে আফ্রিকা থেকে নটি দলের পরের রাউন্ডে আসা অবশ্যই বড় কৃতিত্বের। প্রথম ষোলতে এল মরক্কো আর মিশর। আর প্রথম আটে মরক্কো। তারপরেও যদি বলতে হয়, এবারের বিশ্বকাপের সেরা চমক কে? একটি দেশের কথা একবাক্যে উঠে আসবে, তা হল কেপ ভার্দে। এবার বিশ্বকাপের আগে পাঁচ লক্ষ জনসংখ্যার এই ছোট্ট দেশটির নাম কজন জানতেন, সেটাই সন্দেহ। গ্রুপ পর্বে স্পেন, উরুগুয়ের মতো দেশকে আটকে দিল। নকআউটে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে কী দুরন্ত লড়াই। দু’বার এগিয়ে গেল আর্জেন্টিনা। কী আশ্চর্য! দুবারই সমতা ফেরালো এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি। একেবারে এক্সট্রা টাইমের শেষবেলায় হারতে হল ঠিকই, কিন্তু এই দুরন্ত লড়াই ফুটবলের লোকগাথায় ঢুকে গেল। পরের রাউন্ডে আর্জেন্টিনাকে আরও চাপে ফেলে দিল আফ্রিকারই আরেক শক্তি মিশর। প্রায় ৮০ মিনিট পর্যন্ত দু’গোলে এগিয়ে থাকা। আর্জেন্টিনা হারছে ধরে নিয়ে অনেকে মাঝরাতে টিভি বন্ধ করে ঘুমিয়েও পড়েছিলেন। সকালে উঠে তাঁরা বোধ হয় নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারেননি। মেসিদের দুরন্ত প্রত্যাবর্তন দেখা হল না বলে নির্ঘাত অনেকে সারাজীবন আক্ষেপ করে যাবেন। গ্রুপ লিগে যে আর্জেন্টিনা পরপর তিন ম্যাচে জিতে মসৃণভাবে উঠে এল, নকআউটে পরপর দুই ম্যাচে তাঁদের কী কঠিন দুটো হার্ডল পেরোতে হল!
কঙ্গোর লড়াইকেই বা ভুলবেন কী করে? প্রথম ম্যাচেই রুখে দিল ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পর্তুগালকে। দুরন্ত লড়াইয়ে ড্র কলম্বিয়ার সঙ্গে, হারাল উজবেকিস্তানকেও। আর নকআউটে ইংল্যান্ডকে শুরু থেকেই চাপে ফেলে দিয়েছিল। যদিও শেষরক্ষা হল না। মিশরও ছিল বড় চমক। বেলজিয়াম, ইরানের সঙ্গে ড্র, নিউজিল্যান্ডকে হারানো। নকআউটে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো। আর শেষ ষোলোর লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে সেই রুদ্ধশ্বাস লড়াই।
তবে সবচেয়ে লম্বা রেশের ঘোড়া অবশ্যই মরক্কো। সেই ১৯৭০ থেকে তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু। ১৯৮৬ তে আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে নকআউটে। কাতার বিশ্বকাপে তো সবাইকে চমকে দিয়ে সেমিফাইনালে। এবার সেমিফাইনালের দরজা খুলল না ঠিকই, তবে শেষ আটে আসা একমাত্র আফ্রিকার দল মরক্কোই। আফ্রিকার একমাত্র দেশ হিসেবে পরপর দু’বার শেষ আটে ওঠার কতিত্বও এই মরক্কোরই মুকুটে। গতবার সেমিফাইনালে হারতে হয়েছিল ফ্রান্সের কাছে। এবার কোয়ার্টারেও বিদায়ঘণ্টা বাজল ফ্রান্সের হাতেই।
হারাধনের দশটি ছেলে। একে একে সেমিফাইনালের আগেই সবাই দেশে ফেরার বিমান ধরল। নটি দেশ উঠে এল। শেষপর্যন্ত একটি দলও সেমিফাইনালের আঙিনায় এল না! শুরুর দুরন্ত চমক শেষের দিকে ধরে রাখা গেল না কেন? আসলে, শুরুর দিকে তাদের ঘিরে তেমন প্রত্যাশার চাপ ছিল না। তেমন কোনও প্রত্যাশা ছিল না বলেই মুক্ত মনে নিজেদের উজাড় করে দিতে পেরেছিলেন ফুটবলাররা। যেই প্রত্যাশা ঘিরে ধরতে শুরু করল, অমনি সেই চাপের মুখে কিছুটা যেন গুটিয়ে গেল। ফুটবল বিশারদদের অনেকেই মনে করছেন, তেমন অভিজ্ঞতা নেই বলেই শেষদিকের এই চাপটা সামলাতে হিমশিম খেয়েছে এই দেশগুলি।
অনেকের আশঙ্কা ছিল, এবার ৪৮টি দেশ হওয়ায় শুরুর দিকে একেবারেই একপেশে হয়ে উঠবে। আফ্রিকার দশটি দেশ বিশ্বকাপে বাড়তি বোঝা কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু সেয়ানে সেয়ানে টেক্কা দিয়ে আফ্রিকার দেশগুলি অন্তত বুঝিয়ে দিল, বিশ্বকাপের আঙিনায় তারা মোটেই বেমানান নয়। কোথায় এগিয়ে, কোথায় পিছিয়ে, এই মহামঞ্চ তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। কে বলতে পারে, এই অনভিজ্ঞতার মেঘ সরিয়ে পরের বিশ্বকাপে তারা আরও ঝলমলে হয়ে উঠবে না!
