স্বরূপ গোস্বামী
পুজো জুড়ে কী তাণ্ডবলীলাটাই না চলল! পুজোর সময় রাজনীতির তরজা সাধারণত মুলতুবি থাকে। বড়জোর, রাজনীতিকরা কে কোথায় আঞ্জলি দিচ্ছেন, কে কীভাবে জনসংযোগ করছেন, কে কী পোশাক পরছেন, এইসব উঠে আসত।
কিন্তু সেসবকে ছাপিয়ে এবার উঠে এল, আজ সকালে কোথায় স্টল ভাঙা হল, বিকেলে কোথায়। কোথাও সনাতনী নামধারী ওই বীরপুঙ্গবরা ভেঙে গেল। কোথাও গুটখা খেতে খেতে কোনও উজবুক সনাতনী পুজো নিয়ে ভাষণ দিচ্ছেন। কোথাও পুলিশ এসে নোটিশ ধরাচ্ছেন, কোথাও স্টল ভাঙতে বুলডোজার চলে এল! এই সব তরজা নিয়েই মেতে রইল চ্যানেলগুলি। মেতে রইল সোশ্যাল মিডিয়া।
চারদিনের নানা সার্কাস দেখে মনে হল, পুজোয় বামপন্থীদের বইয়ের স্টল ভাঙাই প্রশাসনের অগ্রাধিকার। সব স্টল থাকবে, শুধু বইয়ের স্টল থাকবে না। কী আজব এক ফতোয়া। এরই মাঝে তিনটি ভিন্ন কঠস্বর। তিনটিই এল শাসক শিবির থেকে। একজন শমীক ভট্টাচার্য। একজন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। একজন আরএসএসের জিষ্ণু বসু।
এই তিনজন দ্বর্থ্যহীন ভাষাতেই বইয়ের স্টল ভাঙার বিরোধিতা করলেন। কেউ বললেন, এটা কখনই আমাদের সংস্কৃতি নয়। কেউ বললেন, যা হয়েছে, লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। তাঁরা যতই এই ঘৃণ্য ঘটনার নিন্দা করুন, দলের নিচুতলা পর্যন্ত এই বার্তা পৌঁছলোই না। বা বলা ভাল, নিচু তলার ওই বীরপুঙ্গবরা তাঁদের কথাকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনলেন না।
এই তিনজনকে নিয়ে নানা বিদ্রুপ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। এই তিনজন আগে থেকে কেন বুঝতে পারেননি, কেন আটকাতে পারেননি, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এই সময়ে দাঁড়িয়ে এই ঘটনার নিন্দা করাটাও যে বেশ সাহসিকতার পরিচয়, সেটাও বুঝতে হবে। বিরোধী হয়ে সমালোচনা করা অনেক সহজ। কিন্তু শাসকের অংশ হয়ে এই ঘটনাকে ধিক্কার দিতে গেলে বুকের পাটা লাগে বইকি! স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী স্টল বসতে না দেওয়ার হুঙ্কার দিচ্ছেন, স্টল ভাঙতে প্রশাসনকে কার্যত লেলিয়ে দিচ্ছেন, একদল স্বঘোষিত সনাতনী প্রবল উৎসাহে স্টল ভাঙতে নেমে পড়েছে। একের পর এক বই আছাড় মারছে। এই অবস্থায় সরকারের মন্ত্রী হয়ে এই ‘প্রশাসনিক গুন্ডামি’র বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া খুব সহজ ব্যাপার নয়। স্বপন দাশগুপ্ত হয়তো তাঁর স্বভাবসুলভ মার্জিত ভঙ্গিতে বলেছেন। কিন্তু এই নরম কণ্ঠস্বরের মধ্যেও দৃঢ়তা কোনও অংশে কম ছিল না। তিনি খুব ভাল করেই জানেন, এই গুন্ডাদের বিরুদ্ধে বলা মানে, কার্যত মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বলা। তিনি খুব ভাল করেই জানেন, মুখ্যমন্ত্রীর উস্কানি না থাকলে এই গুন্ডাদের সাহস হত না স্টলে এসে ভাঙচুর করার। তিনি খুব ভাল করেই জানেন, প্রশাসনের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে নির্দেশ না এলে এভাবে বুলডোজার বা ময়লা ফেলার গাড়ি আনা সম্ভব ছিল না। তারপরেও তিনি সোচ্চার হয়েছেন।
আর দশজনের মতো তিনিও চুপ করে থাকতেই পারতেন। আবোল তাবোল চারটে তাত্ত্বিক কথা বলে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিতেই পারতেন। কিন্তু তিনি রাজধর্মই পালন করেছেন। স্বপন দাশগুপ্ত, আপনার সাহসিকতাকে কুর্নিশ না জানিয়ে উপায় নেই। বুঝিয়ে দিলেন, নম্র স্বরেও সাহসিকতা লুকিয়ে থাকে। মুখ্যমন্ত্রী যতই দু’বাহু তুলে আস্ফালন দেখিয়ে থাকুন, পুলিশের বলে বলীয়ান হয়ে যতই হুমকি দিন, দিন দিন তাঁকে কেমন যেন ভীরু ও কাপুরুষ মনে হচ্ছে। ভীরুরাই বেশি জোরে চিৎকার করে। এই মন্ত্রিসভায় সাহসী যদি কেউ থেকে থাকেন, তিনি স্বপন দাশগুপ্ত। অন্তত পুজোর চারটে দিনে এই সত্যিটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল।
