এই অলীক কুনাট্যের কোনও দরকার ছিল!

স্বরূপ গোস্বামী
মাঝে মাঝেই একটা কথা শোনা যায়, লোকসভা বা বিধানসভায় স্পিকারের পদ খুবই সম্মানের। তাঁর সমালোচনা করা যায় না। দলের লোকেরাও বলে থাকেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক সেজে টিভিতে বসা লোকেরাও বলে থাকেন। নানা সময়ের স্পিকার মশাইরাও এমনটাই বলে থাকেন।

স্পিকারের পদের সম্মান রক্ষার যাবতীয় দায়িত্ব যেন অন্যদের। স্পিকারের নিজের কোনও দায়িত্ব নেই। স্পিকারকেও যে কিছু নিয়ম নীতি মেনে চলতে হয়। নিজের চেয়ারের সম্মান নিজেকেই ধরে রাখতে হয়। এটুকু আর বলা হয় না। কী লোকসভা, কী বিধানসভা, সাম্প্রতিক কালের স্পিকারের চেয়ারে যাঁরাই বসেছেন, তাঁরা নিজের পদের গরিমা রক্ষা করতে পারেনি। নিজের পদমর্যাদাকে নিজেরাই কার্যত ভূলুণ্ঠিত করেছেন।

গত ১৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় স্পিকারের চেয়ারে বসে বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় সেই চেয়ারকে যথেষ্ট কলঙ্কিত করেছেন।। তালিকা করতে গেলে তার শেষ হবে না। বিধানসভা গরিমা সম্পর্কে তাঁর কোনও ধারনাই ছিল না। ওই চেয়ারে বসতে গেলে যে নূন্যতম মেরুদন্ড ও সৎ সাহস লাগে, সেটুকু তাঁর ছিল না। আইন কানুন সম্পর্কে সম্যক ধারণাও ছিল না।  শাসক পক্ষের হুকুম তামিল করাই যেন তাঁর একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গত ১৫ বছরে অন্তত শতাধিক বিধায়ক বিরোধীদলের টিকিটে নির্বাচিত হয়ে অবলীলায় শাসক দলে যোগদান করেছেন। কারও সদস্যপথ খারিজ হয়নি। সেই বিধায়করা জানতেন তাঁদের কিছুই হবে না।
লোকসভার ক্ষেত্রেও এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি। প্রত্যক্ষ দল বদলের তেমন অভিযোগ হয়তো নেই, কিন্তু সরকার পক্ষকে খুশি করতে এমন এমন ফরমান ওম বিড়লা জারি করেছেন, যা দেখলে অতীতে স্পিকাররা লজ্জা পেতেন। এমন এমন নিয়ম জারি করেছেন, অতীতে যার কোনও নজির নেই। একের পর এক বেনিয়মেই গদি মিডিয়া ধন্য ধন্য করে গেছে।  এবার রাজ্যে পালাবদল। প্রথমবার নির্বাচিত বিধায়ককেই স্পিকারের আসনে বসিয়েছে বিজেপি। এটা হয়তো তাদের কিছুটা বাধ্যবাধকতা। কারণ বিজেপির টিকেটে যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের অধিকাংশই এবার প্রথম বিজয়ী। কিন্তু স্পিকার হয়েই মাননীয় রথীন্দ্র বসু যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তা গত সাত দশকের বিধানসভায় নজিরবিহীন।

তৃণমূলের টিকিটে এবার ৮০ জন বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। বিরোধী দলনেতা হিসেবে পাঠানো হয়েছিল শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এর নাম। সেই চিঠিতে পদ্ধতিগত কিছু ত্রুটি থাকতেই পারে। নতুন করে আবার চিঠি পাঠানো হয়। সেই চিঠি দিনের পর দিন ফেলে রাখা হল। বর্ষীয়ান শোভনদেব বাবুকে বিরোধী দলনেতার মর্যাদা দেওয়া হয়নি। তখনও আসল কারণটা বোঝা যায়নি।। হঠাৎ দেখা গেল, নতুন একটি গোষ্ঠী গজিয়ে উঠল। তাঁরা সই করা চিঠি জমা দিলেন। তড়িঘড়ি সেই হঠাৎ গজিয়ে ওঠা গোষ্ঠীর নেতাকে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি দেওয়া হল। অধিকাংশ বিধায়ক যাকে নেতা হিসেবে চাইবেন, তিনি বিরোধী দলনেতা হবেন, এটাই পরিষদীয় নিয়ম। সেই হিসেবে শোভন দেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম অনেক আগেই ঘোষণা হওয়ার কথা। কয়েকজনের সই নিয়ে নাকি বিতর্ক। কিন্তু সেই চিঠি তো জমা পড়েছে অনেক পরে। কয়েকজনের নাম নিয়ে যদি বিতর্ক থেকেও থাকে, অন্তত ৬০ জন বিধায়ক যে শোভন দেব বাবুর নামে সম্মতি জানিয়েছিলেন, এটা নিয়ে তো কোনও দ্বিমত নেই। স্পিকার মশাই চাইলে সবাইকে হাজির হতে বলতে পারতেন। তারা সই করেছেন কিনা, যাচাই করতে পারতেন। কিন্তু দিনের পর দিন সেটি ঝুলিয়ে রাখা হল। এর কারণ কী, তখন বোঝা যায়নি। বোঝা গেল কয়েকদিন পরে।

বিরোধীপক্ষের দুই বিধায়ক অভিযোগ আনলেন। তড়িঘড়ি সেটি থানায় পাঠানো হল। যারা স্পিকার কে অভিযোগ জানালেন, সেই নাম বাইরে ফাঁস হয়ে গেল। তারা নতুন গোষ্ঠী তৈরি করলেন। তড়িঘড়ি তাকে অনুমোদন দেওয়া হল। নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় এর কোনও সিদ্ধান্তই তাঁর নেওয়া নয়। একদিন আগে জরুরী তলব পেয়ে তিনি যে দিল্লীতে উড়ে গিয়েছিলেন, এটা পরের দিন প্রায় প্রতিটি বাংলা কাগজেই লেখা হয়। তাঁর দিক থেকে কোনরকম রেজইন্ডার পাঠানো হয়েছে এমন কোনও খবর নেই। অর্থাৎ তিনি যে দিল্লির ডাক পেয়ে উড়ে গিয়েছিলেন, তিনি যে বিশেষ জায়গায় বিশেষ বৈঠক করেছেন, তা নিয়ে বিশেষ সংশয় নেই। অর্থাৎ স্পিকার কি ভূমিকা পালন করবেন, তা নির্ধারিত হচ্ছে অন্য জায়গায়। যেমন নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, তিনি ঠিক সেই নির্দেশই পালন করছেন। এখনও বিধানসভার অধিবেশন শুরুই হল না। তার আগেই স্পিকারকে বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করার নোংরা খেলা শুরু হয়ে গেল।
হয়তো বলা হবে প্রমাণ কোথায়? সরকারের পক্ষে প্রমাণ জোগাড় করা যতখানি সহজ, প্রমাণ লোপাট করাও ততখানি সহজ। অন্যদের কাছে প্রমাণ করার বা লোপাট করার সুযোগ অনেক কম। স্পিকার বিশেষ বিমানে দিল্লি উড়ে গেছেন, এমন খবর অধিকাংশ চ্যানেলে যেমন বলা হল, পরের দিন অধিকাংশ প্রথম সারির দৈনিকেও প্রকাশিত হল। এটা স্পিকারের পক্ষে খুব সম্মানজনক? এতদিন পেরিয়ে গেল। তার দপ্তর থেকে কোনও প্রতিবাদ পত্র এসেছে? অর্থাৎ তিনি যে জরুরি তলবে দিল্লি গিয়েছিলেন, এটা জলের মতো পরিষ্কার। কোনও প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না।

ঠিক পরের দিন, একদল দাবি করে বসলেন তারাই আসল তৃণমূল। এবং তাদেরই বিরোধী দলের স্বীকৃতি দিয়ে দেওয়া হল। প্রথম চিঠিকে ফেলে রাখা হল অনন্তকাল। দ্বিতীয় তৃতীয় অনুমোদিত হয়ে গেল দু ঘণ্টার মধ্যেই। পক্ষপাতীত্বের একটা সীমা থাকে। শুরুতেই সেই সীমা নির্লজ্জ ভাবে লংঘন করলেন অধ্যক্ষ। বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় ১৫ বছর ধরে বিধানসভার রীতিনীতির তোয়াক্কা করেননি। একের পর এক বাজেটকে গিলোটিনে  পাঠিয়েছেন। অনৈতিক ও বেআইনি দলত্যাগকে বৈধতা দিয়েছেন। বিরোধীদের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করেছেন। নতুন স্পিকার শুরু থেকেই দলদাসের ভূমিকায়। বাংলার বিধানসভায় কোনও বিশ্বাসযোগ্য বিরোধী দল থাকবে না? সরকারপক্ষের সাজানো কিছু মুখ বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি পাবে? এত বড় কলঙ্ক বাংলার বিধানসভার গায়ে কে লাগালেন? যে শাসক বিরোধীদের ভাঙতে চায়, সে শাসক বড়ই নিকৃষ্ট। আর সেই চক্রান্তের স্পিকার যদি সামিল হন, তাহলে সেই স্পিকারের জন্য ধিক্কার ছাড়া আর কিছুই দেওয়ার থাকেনা।


এদের হাতে আর যাই হোক, বিধানসভার সুরক্ষিত থাকতে পারে না। এখনও অধিবেশন শুরুই হল না। তার আগেই একরাশ কলঙ্ক নিয়ে পথ চলা শুরু করল নতুন বিধানসভা। এ কত বড় লজ্জা, এটুকু বোঝার ক্ষমতা স্পীকার সাহেবের নিশ্চিতভাবেই এখনও হয়নি।

Previous post এমন সাজানো বিরোধী দল! তৃণমূলের নয়, সরকারেরই লজ্জা বাড়ল
Next post কোনও তদন্ত নয়, নির্লজ্জ ছ্যাবলামিই আমাদের প্রাপ্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *