সরল বিশ্বাস
একের পর এক নোটিশ আসছে তাঁর নামে। কোনওদিন নোটিশ পাঠাচ্ছে কলকাতা পৌরসভা। কখনও হাজির হওয়ার ফরমান জারি করছে কলকাতা পুলিশ। কখনও এফ আই আর করা হচ্ছে ভিন রাজ্যে। কখনও আবার পুরনো মামলায় ডেকে পাঠাচ্ছে ইডি। সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে খবর হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় নানারকম বিদ্রুপ ও টিপ্পনীও চলছে। মোদ্দা কথা, প্রতিদিন খবরের শিরোনামে অভিষেক ব্যানার্জি।
কখনও বলা হচ্ছে, তাঁর বাড়ির নির্মাণের পেছনে অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। কখনও বলা হচ্ছে, ভোটের আগে তিনি যে ভাষণ দিয়ে দিয়েছিলেন, তাতে উত্তেজনা ছড়াতে পারতো। অর্থাৎ সরকার, নানাভাবে তাঁকে ব্যতিব্যস্ত রাখতে চাইছে। অন্তত এই ছবিটাই জনতার সামনে তুলে ধরতে চাইছে। কখনও মাঝরাতে সিআইডি তার বাড়িতে হানা দিচ্ছে। তল্লাশি করছে। কখনও তাঁকে ফোনে ডেকে এনে নোটিশ ধরিয়ে দিচ্ছে। দেখে অনেকেই খুব মজা পাচ্ছেন। ভাবছেন অভিষেক ব্যানার্জির এমনটাই তো প্রাপ্য ছিল।
কোনও সন্দেহ নেই, অভিষেক ব্যানার্জি একজন রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত। বাংলার রাজনীতিকে তিনি যে নর্দমায় নামিয়ে এনেছিলেন, কোন ধিক্কারই তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়। আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তিই তাঁর প্রাপ্য। কিন্তু এখন সরকার তাঁর সঙ্গে যে আচরণ করছে, তা সরকারি অসভ্যতাকেই বড় বেশি করে প্রকট করছে। যথার্থ তদন্তের থেকেও গ্যালারি শোর প্রবণতা যেন অনেক বেশি।
বলা হতেই পারে, অভিষেক ব্যানার্জি অপরাধ করেছেন তার কী প্রমাণ? রাজ্য সরকার তাঁর অপরাধকে আড়াল করবে, সেটাই স্বাভাবিক ছিল। পিসি মুখ্যমন্ত্রী থাকলে ভাইপোর অনেক অপরাধ লঘু হয়ে যায়। প্রমাণও থাকে না। তাকে বাঁচানোর দায়িত্ব তাঁর পিসির ছিল। কিন্তু দিল্লির কর্তারা কেন এতদিন এমন দুর্বৃত্তকে আগলে রেখেছিলেন, সেই প্রশ্নটাও যেন হারিয়ে না যায়। সিবিআই হোক বা ইডি, তদন্তের নামে তারা যে ভন্ডামি দেখিয়েছেন, একই রকম ঘৃণা তাদেরও প্রাপ্য। তাই অভিষেক ব্যানার্জিকে যে ডিম ছোঁড়া হচ্ছে, তা যদি ঘৃণার প্রতীক হয়, তবে এই ঘৃণা সিবিআই ও ইডিরও প্রাপ্য। যাঁরা সিবিআই ও ইডিকে পরিচালনা করতেন, তাঁদেরও প্রাপ্য। এই ভূমিকার যথার্থ তদন্ত হবে তো? নিশ্চিত থাকতে পারেন, কোনওদিনই হবে না।
যে ধরনের অপরাধের সঙ্গে অভিষেকের নাম এতদিন জড়িয়ে ছিল, তা শুধু রাজ্য প্রশাসনের সহায়তায় সম্ভব ছিল না। গরু পাচার হোক বা কয়লা, কেন্দ্রে সহায়তা ছাড়া এই দুটি অপকর্ম মসৃণভাবে করা সম্ভব ছিল না। নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে আরও যাবতীয় দুর্নীতির তদন্তের দায়িত্বে ছিল সিবিআই। এত বছর ধরে তারা কেন হাত গুটিয়ে বসে ছিল? যে প্রমাণ জোগাড় করতে কোনরকম কসরত করার দরকার নেই, যে প্রমাণ চাইলে একজন সিভিক ভলেন্টিয়ারও অনায়াসে জোগাড় করতে পারেন, সেই সামান্য প্রমাণটুকুও কেন্দ্রীয় এজেন্সি আদালতের সামনে তুলে ধরতে পারেননি। যে বখরা অভিষেক পেতেন, দিল্লির প্রভাবশালীদের কাছে যেত না তো? নইলে তাকে বাঁচানোর কিসের এত তাগিদ? আজ যারা শুধু অভিষেক কে ধিক্কার দিচ্ছেন, তাদের ঘিলুতে যদি এতোটুকু বুদ্ধি থাকতো, তাহলে একই রকম ধিক্কার দিল্লির ওই মাতব্বরদেরও দিতেন। অন্তত তাদের নামে জয়ধ্বনি করতেন না।
এখনও যেসব ধারায় অভিষেকের উপর মামলা হচ্ছে, তা নেহাতই ছেদো। এইসব মামলায় যে বড়সড় শাস্তি হবে না, এটা সবাই জানে। আসলে দিল্লির প্রভুরা, এখনও লোক দেখানো নাটকই করতে চায়। অভিষেকের টাকার উৎস নিয়ে তদন্ত করলে, সেই টাকা আরও কোথায় কোথায় পৌঁছতো, সেটাও বেরিয়ে আসবে। দিল্লির প্রভুরা কখনই সেটা চাইবেন না। কারণ, এতে তাঁদেরও মুখ পড়বে। তাই অভিষেককে নোটিশ পাঠানোর নামে এই প্রশাসনিক ছ্যাবলামি বন্ধ হোক। লোক দেখানো নাটক অনেক হয়েছে।
এতকিছু করার কোনও দরকারই ছিল না। আচ্ছা, অভিষেকের শিক্ষাগত যোগ্যতা কী? হলফনামায় তিনি যে যোগ্যতার কথা উল্লেখ করেছেন, তা কি সত্যি? নির্বাচন কমিশনে এ নিয়ে তো অভিযোগ জানানো যায়। কোনও অভিযোগ জমা পড়ে নি কেন? এমনকি নির্বাচনে জেতার পর সংসদে নতুন করে ফরম ফিলাপ করতে হয়। সেখানেও নিজের ব্যাপারে যাবতীয় তথ্য জানাতে হয়। সেই তথ্যই ছাপা হয় সংসদের বইয়ে। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনে তিনি যা জানিয়েছিলেন, লোকসভার সচিবালয় কেও একই তথ্য জানিয়েছিলেন। বিজেপির যে কোনও সাংসদ লোকসভার অধ্যক্ষের কাছে চিঠি লিখতেই পারেন। তদন্তের দাবি জানাতেই পারেন। লোকসভার অধ্যক্ষ বড়জোর সাত দিন তাকে সময় দিতে পারেন। সেই সাত দিনের মধ্যে উপযুক্ত প্রমাণ দাখিল না করতে পারলে সাংসদ পদ খারিজ হওয়ার কথা।
কিন্তু নিশ্চিত থাকুন, বিজেপির কোনও এমপি এমনটা করবেন না। এমনকি তথাকথিত বিদ্রোহী এমপিরা, যাঁরা অভিষেকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন, তাঁরাও এমন চিঠি লিখবেন না। কারণ তাহলে সত্যিই অভিষেকের সাংসদ পদ খারিজ হয়ে যাবে।
শুধু যদি অভিষেকের সাংসদ পথ খারিজ হওয়ার ব্যাপার থাকতো, তাহলে হয়তো অতি উৎসাহে কেউ কেউ এমন চিঠি লিখে ফেলতেন। কিন্তু ঝোলা থেকে যে অন্য বিড়াল বেরিয়ে পড়বে। আরও বড় কোনও কোনও মাথা এমনই ভুয়ো হলফনামা দিয়ে বসে আছেন। তখন যে তিনিও বিপাকে পড়বেন।
অতএব, অভিষেকের বাড়িতে পৌরসভা নোটিশ পাঠাবে। আপনার বাড়ির পাঁচিলটা একটু বেরিয়ে আছে, এই মর্মে জবাবদিহি চাওয়া হবে। কখনও মাঝরাতে সিআইডি হানা দেবে। এই ছ্যাবলামি টুকুই আমরা দেখব। তাই নিয়ে ধেই ধেই করে নাচবো। কোন তদন্ত নয়, কোন সুবিচারও নয়, দিনের শেষে এই ছ্যাবলামি টুকুই আমাদের প্রাপ্য।
