জনতার ক্ষোভেও লাগাম আসুক

শাসক চিরকাল শাসক থাকে না। ঠিক তেমনই বিরোধীরাও চিরকাল বিরোধী থাকে না। এটাই গণতন্ত্রের মহিমা। আমাদের রাজ্যের সাম্প্রতিক পালা বদলে কতগুলো ছবি স্পষ্ট। শাসকদলের প্রতি যখন তীব্র অনাস্থা ও ক্ষোভ তৈরি হয়, তখন মানুষ ব্যালটের মাধ্যমেই তার জবাব দেন। জনতা বুঝিয়ে দেয়, কোনও কিছুই তার চোখ এড়ায়নি। সে সবকিছুই দেখছে, নিজের মতো করে হিসেব রাখছে। অনেক পুঞ্জিভূত বিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হয় এই ব্যালটের মাধ্যমে। আমাদের গণতন্ত্র আসলে কতটা শক্তিশালী, সেটা আরও একবার পরিষ্কার।
এক শাসক যায়, অন্য শাসক আসে। আগের শাসকের প্রতি অনাস্থার পাশাপাশি নতুন শাসকের প্রতি তৈরি হয় আস্থা। কিন্তু ব্যালটের রায় দেওয়ার পরেও আরও অনেক কিছু বলার বাকি থেকে যায়। কেউ পাড়ার আড্ডায়, কেউ সমাজ মাধ্যমে উপরে দেন এতদিনের জমিয়ে রাখা ক্ষোভ। তখন তা উঠে আসে আরও উগ্রভাবে। অপছন্দের কাউকে দেখলেই সে তাড়া করে, দূর থেকে গালাগাল দেয়, কেউ কেউ ঢিল ছোড়ে। গত কয়েকদিনে এমন বেশ কয়েকটি ঘটনার সাক্ষী রইল বাংলা। পঞ্চায়েত সদস্য হোন বা সংসদ। কাউকেই আমজনতা তেমন রেয়াত করছে না। অনেক সময়ই মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে।
দুর্নীতি এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনেক সময়ই মানুষ সোচ্চার হতে পারে না। কারণ, শাসকের হাতে থাকে রাষ্ট্রশক্তি, সেই সঙ্গে বিভিন্ন গুন্ডা মস্তানরাও থাকে শাসকের এই বৃত্তে। ফলে প্রতিবাদ করতে গেলে নানাভাবে আক্রান্ত ও হেনস্থার শিকার হতে হয়। তাই মানুষ সোচ্চার হয়ে প্রতিবাদ করতে পারে না ঠিকই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা রাগের বিস্ফোরণ চলতেই থাকে। একটু সুযোগ পেলেই সেই ক্ষোভ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। হুমকি ও চোখ রাঙানিরবিরুদ্ধে সে গর্জে ওঠে।
পুলিশের বৃত্ত চিরকাল থাকে না, ক্ষমতার আশ্ফালনও চিরস্থায়ী নয়। এই সহজ সত্যটা অনেক সময় অনেক ক্ষমতাবান লোকেরা ভুলে যান। কিন্তু জনতা জাগ্রত। সে সুযোগ পেলেই ঠিক মনে করিয়ে দেয়। একদিকে জনতার পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, অন্যদিকে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা। দুটি আঙ্গিক থেকেই বিষয়টিকে দেখা দরকার। মানুষের রাগ ও ক্ষোভ থাকবে । কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশ যেন কদর্য ভাবে না হয়, মানুষ যেন নিজের হাতে আইন তুলে না নেয়, নতুন শাসকের কাছে এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। বিরোধী নেতারা যদি দিকে দিকে আক্রান্ত হতে থাকেন, তবে সেটাও গণতন্ত্রের পক্ষে উদ্বেগের। আইন ও প্রশাসন তার মতো করে ব্যবস্থা নিক। কিন্তু ক্ষোভে উন্মত্ত জনতা যেন বারবার এভাবে আইন হাতে তুলে না নেয়। কারণ এই প্রবণতা ছড়িয়ে গেলে তা গণতন্ত্রের পক্ষে খুব একটা উজ্জ্বল হবে না। এমনকি বিরোধীদের গোষ্ঠী কোন্দলেও যেন এমন পাল্টা আক্রমণের ঘটনা না ঘটে, সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে প্রশাসনকে।
তাই বিরোধী নেতা আক্রান্ত হলে সেটা মোটেই উল্লাসের বিষয় নয়। বরং উদ্বেগের বিষয়। কোথাও কোথাও বিকৃত উল্লাস দেখা যাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু এটাও যে কাম্য নয়, সেটাও দৃঢ়ভাবে বলা দরকার। আইন নিশ্চয়ই আইনের কাজ করবে। কিন্তু বিরোধীরাও যেন তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নির্ভয়ে চালিয়ে যেতে পারে, সেটা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।

Previous post জুনিয়রকে আমরা কত সহজে ভুলে গেলাম!‌
Next post ‌দোহাই, এই দলবদলু ‘‌চরিত্রহীন’‌দের বিদ্রোহী বলবেন না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *