রক্তিম মিত্র
বিস্তর গবেষণা করে গবেষকরা জানতে পারলেন, গরু ঘাস খায়। ঠিক তেমনই, সদ্য তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে জেতা বিধায়করা যেন জানতে পারলেন তৃণমূল দলে কোনও গণতন্ত্র নেই। তাঁরা এটাও জানতে পেরেছেন যে, তৃণমূল একটি দুর্নীতিগ্রস্ত দল। অতএব, দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত প্রায় ৬০ জন বিধায়ক আলাদা মঞ্চ গঠন করলেন। তাঁরাই নাকি আসল তৃণমূল। বিরোধী দলনেতা হিসেবে তুলে ধরা হল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে। অর্থাৎ মমতা ব্যানার্জি নন, তৃণমূল নেতৃত্বের লাগাম নাকি এখন ঋতব্রতর হাতে।
নির্বাচনে জয় পরাজয় আছে। বিজেপি জয়ী হয়েছে, তৃণমূল পরাজিত হয়েছে, এটাও দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার। অনেকের কাছে এমনটা হয়তো প্রত্যাশিতই ছিল। তাই বলে কুড়ি দিনের মধ্যে দলে এমন ভাবে ভাঙন ধরবে, এতখানি কেউই ভাবতে পারেননি। শুধু বিধানসভা নয়, এই ভাঙন সংক্রমিত হয়েছে লোকসভাতেও। এক মাস আগেও যাঁরা মমতা ব্যানার্জি এবং অভিষেক ব্যানার্জি বলতে অজ্ঞান ছিলেন, তাঁদের গলাতেই এখন বিদ্রোহের সুর। তাই অভিষেক ব্যানার্জিকে তো বটেই, এমনকি তাঁরা মমতা ব্যানার্জির ছায়াও মাড়াতে চাইছেন না। স্বয়ং মমতাও আসরে নেমে দলের ভাঙন রুখতে কার্যত ব্যর্থ।
কিন্তু কেন এই ভাঙন ধরল? ভেতরে ভেতরে অনেকেই যে বিক্ষুব্ধ ছিলেন, এটা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। হয়তো সেই ক্ষোভ অনেকটাই সঙ্গত। কিন্তু এতদিন দলের মধ্যে কেউ তো সোচ্চার হননি। এমনকি দলের পরাজয়ের পরেও দলীয় বৈঠকে এদের সোচ্চার হতে দেখা যায়নি।দল ক্ষমতায় এলে এরাই ফের নেত্রী ও সেনাপতির নামে জয়ধ্বনি শুরু করতেন।। এদেরই অনেক মন্ত্রী হতেন। গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর সামলাতেন। কিন্তু যেহেতু দল ক্ষমতায় নেই, অতএব দলের সবটাই খারাপ। কিন্তু ঋতব্রতকে ঘিরে ৬০ জন বিধায়ক একত্রিত হলেন, এটাও তেমন বিশ্বাসযোগ্য নয়। ৬০ জন তো দূরের কথা, ঋতব্রতর নেতৃত্বে পাঁচজনও শামিল হতেন কিনা, সেটাই মস্ত বড় সংশয়। আড়ালে নিশ্চিতভাবেই অন্য কোনও ইন্ধন রয়েছে। ঋতব্রতকে সামনে রেখেই পাল্টা মঞ্চ তৈরি করতে হবে, হয়তো এমন কোন বার্তা এসেছিল। সরকার পক্ষের সঙ্গে কোনও অদৃশ্য বোঝাপড়াও অসম্ভব কিছু নয়। বিধানসভার অধ্যক্ষ তড়িঘড়ি করে এই পাল্টা মঞ্চকে বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন।
কিন্তু এই তথাকথিত বিদ্রোহীরা কি বিধানসভায় যথার্থ বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে পারবেন? সরকারের কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি হয়তো উঠে আসবে। কিন্তু সেই বিরোধিতা যে একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় বাঁধা থাকবে, এটা এখনই বলে দেওয়া যায়। যতটুকু সমালোচনা সরকার হজম করতে পারবে, ঠিক ততটুকুই সমালোচনা হবে। সরকার অস্বস্তিতে পড়তে পারে, এমন পরিস্থিতি নিশ্চিতভাবেই তৈরি হবে না। এই বিরোধী দল আসলে কাদের বিরোধী? সরকারের বিরোধী? নাকি তৃণমূলের বিরোধী? সরকারের ত্রুটি তুলে ধরার চেয়েও তৃণমূলের ত্রুটি তুলে ধরাতেই তাদের আগ্রহ যেন বেশি। কারা বিরোধী হবেন, এটাও যেন সরকারই ঠিক করে দিল।
দলত্যাগ বিরোধী আইন অনুযায়ী, দুই তৃতীয়াংশের বেশি সদস্য একত্রিত হয়ে পৃথক মঞ্চ গঠন করতে পারেন, অন্য কোনও দলে যোগদান করতে পারেন। সেদিক থেকে দেখতে গেলে আইনগত কোনও ত্রুটি নেই। কিন্তু যেভাবে তড়িঘড়ি করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি দিয়ে দেওয়া হল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। সংসদীয় রাজনীতিতে আইনগত দিক যেমন থাকে, তেমনই থাকে নৈতিকতার দিক। এক দলের টিকিটে নির্বাচিত হওয়ার এক মাসের মধ্যেই সেই শিবির ভেঙে বেরিয়ে যাওয়া মোটেই নৈতিকতার পরিচায়ক নয়। যে নেত্রীর জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে তাঁরা জয়ী হলেন, জয়ের পর সেই নেত্রীকেই অস্বীকার করা কতটা যুক্তিযুক্ত? তৃণমূলের যাবতীয় খারাপ দিক জেনেই তাঁরা তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছিলেন। তাছাড়া তৃণমূলের দুর্নীতির দায় তাঁরাও অস্বীকার করতে পারেন না। নিজেদের যোগ্যতায় যেতে আসা তো দূরের কথা, অধিকাংশই তৃতীয় হতে পারবেন কিনা, সেটাই ঘোরতর সংশয়। অনেকে হয়তো নটার থেকেও কম ভোট পাবেন।
যাঁরা তৃণমূল বিরোধী, তাঁরা তৃণমূলের এই ভাঙনে উল্লসিত হতেই পারেন। কিন্তু বাংলার গণতন্ত্রের পক্ষে এটা খুব উজ্জ্বল বিজ্ঞাপন নয়। দল ভাঙানোর সংস্কৃতি এই রাজ্যে আগেও ছিল। তৃণমূলের বিরুদ্ধেও বারবার এই অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু বিরোধী দলে এমন ভাঙন শুধু বাংলা নয়, দেশের রাজনীতিতেই বিরল। এমনিতেই রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থা অনেকটাই কমে এসেছে। তার ওপর এরকম নজির স্থাপন হলে সেই আস্থা আর ও তলানিতে এসে ঠেকবে। এবং এই ঘটনায় আমাদের রাজ্যের ভাবমূর্তিও নিশ্চিতভাবেই অনেকটাই কালিমালিপ্ত হল। এর দায় বিরাট ব্যবধানে জিতে আসা শাসককেও নিতে হবে।
