মলয় সেন
এক সরকার যায়। এক সরকার আসে। মুদ্রার এক পিঠে থাকে বিগত সরকারের প্রতি অনাস্থা। আর মুদ্রার উল্টোদিকে থাকে নতুন সরকারের প্রতি আস্থা। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, নতুন সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড আরও বেশি করে প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে।
এই রাজ্যের সমস্যা প্রচুর। আবার সম্ভাবনাও প্রচুর। একদিকে সমস্যার দিকগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। সেখান থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায়, তার উপায় খুঁজে বের করা। অন্যদিকে, সম্ভাবনার দিকগুলো মাথায় রেখে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্মাণ করা। বড় একটি সমস্যা, রাজ্যের ওপর বিরাট অঙ্কের ঋণের বোঝা। পূর্বতন সরকারের দিশাহীন কিছু কর্মকাণ্ডে এই ঋণ লাগামছাড়া হয়েছে। সুদ–সহ ঋণের বোঝা কমিয়ে আনতে রাজস্ব বাড়াতে হবে। রাতারাতি রাজস্ব বাড়ানোর কোনও যাদুদণ্ডও সরকারের হাতে নেই। এটা দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার। অনেক অপ্রিয় সিদ্ধান্তও নিতে হবে। তাতে জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়াও স্বাভাবিক। সবদিক মাথায় রেখে ভারসাম্যের কোনও রাস্তা বের করতে হবে।
রাজ্যের একটি বড় সমস্যা কর্মসংস্থান। সরকারি, বেসরকারি দুই ক্ষেত্রেই গত এক দশকে নিয়োগ একেবারেই কম হয়েছে। যা নিয়োগ হয়েছে, সেখানেও লাগামছাড়া দুর্নীতির অভিযোগ। স্বচ্ছচা নিয়ে এতটাই সংশয় যে, শিক্ষকদের পুরো প্যানেলই বাতিল করে দিতে হয়েছে। পড়াশোনা করে, পরীক্ষা দিয়ে মেধার ভিত্তিতে চাকরি হয়, এই বিশ্বাসটাই যেন হারিয়ে গেছে। এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা খুবই শক্ত। এই কঠিন চ্যালেঞ্জ সরকারের সামনে। বেসরকারি নিয়োগের জন্যও চাই শিল্পায়ন। রাজ্যে ভারী ও মাঝারি শিল্পস্থাপনের চেহারা মোটেই উজ্জ্বল নয়। বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছে অনেক। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবের মাটিতে নেমে আসেনি। বড় বড় শিল্প সংস্থা এই রাজ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য রাজ্যে বিনিয়োগ করে গেছে। তাঁদের অভিযোগ, বিনিয়োগ বান্ধব পরিস্থিতি নেই। জমি নীতি নিয়েও বিস্তর জটিলতা। তাছাড়া, শিল্প স্থাপন করতে গেলে নানা শর্তপূরণ করতে হয়। নতুন বিনিয়োগ টেনে আনা খুব সহজ ব্যাপার নয়। শুরুতে তাদের নানা রকম ছাড় দিতে হবে। জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া আরও মসৃণ হতে হবে। তবে একটাই আশার কথা, কেন্দ্রের সহযোগিতা এক্ষেত্রে পাওয়া যাবে। সেই ডাবল ইঞ্জিনের সুবিধা নতুন সরকার কতটা কাজে লাগাতে পারে, সেটাও দেখার।
মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান যেমন প্রশ্নের মুখে, তেমনই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাতেও নানা অসঙ্গতি। এই দুই ক্ষেত্রেই সরকারের ভূমিকা তেমন সন্তোষজনক ছিল না। ফলে, বাধ্য হয়েই মানুষকে ছুটতে হয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে। শিক্ষাই হোক আর চিকিৎসাই হোক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মুনাফার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে রাজ্যের আম নাগরিককে। এই অবস্থাও বদলাতে হবে। মেধাবী ছাত্ররা যেন অল্প খরচে সরকারি স্কুল, কলেজেই পড়তে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, সরকারি হাসপাতালেও উন্নত চিকিৎসা হয়, এই আস্থাও ফিরিয়ে আনতে হবে। তার জন্য কোনও সস্তা চটক নয়, সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, তার সঠিক রূপায়ণ আরও বেশি জরুরি।
