ময়দানের মূলস্রোত থেকে তিনি অনেক দূরে। মফস্বলের কেউ তারকা হওয়ার পর কলকাতা মুখী হবেন, সেটাই স্বাভাবিক। তাঁর ক্ষেত্রে উল্টোটা। তাঁর জন্ম কলকাতায়, অথচ সারা জীবনটা কাটিয়ে দিলেন রিষড়ায়। ময়দানের কোনও অনুষ্ঠানে সচরাচর তাঁকে দেখাও যায় না। একটু আড়ালে থাকতেই ভালবাসেন। ভদ্র, বিনয়ী। একইসঙ্গে অত্যন্ত লাজুক। অথচ, এই মানুষটাই মাঠে ছিলেন অন্যরকম। দাপটেরর সঙ্গে খেলে গেছেন। কে? যাঁরা ফুটবলের সামান্যতম খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের জন্য আর কোনও ক্লু দেওয়ার দরকার নেই। সুধীর কর্মকারকে চিনে নিতে এরপর কোনও ভুল হওয়ার কথা নয়।
নিজের মুখে নিজের কথা বলার মানুষ তিনি নন। অনেক বিষয় মনেও রাখেননি। স্বয়ং ফিফা সভাপতি তাঁকে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন, এশিয়ার সেরা ফুটবলার। অথচ, তিনি যেন নিষ্পৃহ, উদাসীন। এমন মানুষের আত্মজীবনীর অনুলিখন সত্যিই বেশ চ্যালেঞ্জের। সেই কঠিন চ্যালেঞ্জটাই নিয়েছিলেন সুতপা ভৌমিক। সেই চ্যালেঞ্জে সসম্মানে উতরে গেছেন। প্রায় দুই দশক ধরে প্রবল যত্ন নিয়ে দিকপাল ক্রীড়াবিদদের লেখা অনুলিখন করেছেন। আজকাল ক্রীড়া দপ্তরের শিক্ষানবিশ কর্মী থেকে দায়িত্বশীল ক্রীড়া সম্পাদক। নানা ব্যস্ততার মাঝেও সুধীর কর্মকারের আত্মজীবনী লেখার ক্ষেত্রে পরিশ্রম ও নিষ্ঠায় কোনও কার্পণ্য ছিল না। তাই যে সুধীর কর্মকার নিজের কথা বলতেই চান না, তাঁর জীবনের নানা জানা–অজানা উপাখ্যান সুন্দরভাবে তুলে এনেছেন দুই মলাটের ভেতর। স্মৃতির অ্যালবামে জমে থাকা ধুলোর আস্তরণ সরিয়ে তুলে এনেছেন নির্ভেজাল মানুষটাকে।
এশিয়ান গেমসে জাপানের কামামাতোকে কীভাবে বোতলবন্দি করলেন রিষড়ার ছোটখাটো চেহারার সুধীর, তা আজও ভারতীয় ফুটবলে রূপকথার মতোই। বেড়ে ওঠার দিনগুলি, পারিবারিক বৃত্ত, ছোট ক্লাবের লড়াই, ইস্টবেঙ্গলের দীর্ঘ সময় ও সতীর্থদের কথা, কেন যেতে হল মোহনবাগানে, এমন নানা অধ্যায় উঠে এসেছে দুই মলাটের ভেতর। তাঁর চোখে সতীর্থরা, আবার সতীর্থদের চোখে তিনি, মুদ্রার দুটো পিঠই সযত্নে তুলে এনেছেন লেখক। বইয়ের নামটিও ভারী চমৎকার— রক্ষণরেখা। এই শব্দটির সঙ্গে ‘লক্ষ্মণরেখা’ শব্দটির ভারি মিল। সুধীর এমন এক ফুটবলার, যিনি একাধারে রক্ষণের স্তম্ভ, আবার ব্যক্তিগত জীবনে সংযম ও সৌজন্যের লক্ষ্মণরেখা কঠোরভাবে মেনে এসেছেন আজীবন।
যাঁর জীবনে যত বেশি বিতর্ক, তিনি নাকি তত ‘বর্ণময়’ চরিত্র। সেদিক থেকে সুধীর একেবারেই ‘বর্ণময়’ নন। তিনি বরাবরই পরিশ্রম করা, শৃঙ্খলা মেনে চলা এক ফুটবলার। যিনি কাউকে ছোট করে নিজেকে বড় করার চেষ্টা করেন না। প্রাণ খুলে অন্যের তারিফ করতে জানেন। সেই তারিফের পিছনে অন্য কোনও অঙ্ক থাকে না। যিনি অকপটে নিজের ভুলকে স্বীকার করতে জানেন। এই সাদামাঠা জীবনের একটা আলাদা ঔজ্জ্বল্য আছে, যার কাছে সব রং ফিকে মনে হয়।
রক্ষণরেখা
সুধীর কর্মকার
সম্পাদনা ও অনুলিখন: সুতপা ভৌমিক
আজকাল
৩০০ টাকা
