(আজ শিক্ষক দিবস। সেই উপলক্ষ্যে একটি ভিন্নস্বাদের লেখা।)
ছাত্রজীবনে কেউ স্কুলের বান্ধবীদের প্রেমে পড়ে,কেউ পাড়ার বান্ধবীদের প্রেমে পড়ে। আমি পড়েছিলাম দিব্যা ভারতীর প্রেমে।
বুঝতেই পারছেন, আমি ছিলাম সিনেমার পোকা। কিন্তু পড়তাম এক মিশনারি স্কুলে। সেখানে নিয়ম কানুন এতটাই কড়া ছিল যে সিনেমা নিয়ে বেশি মাতামাতি করা যেত না। আর নিয়ম কানুন ভাঙলে যে শাস্তি দেওয়া হত তাতে ক্লাস কেটে সিনেমা দেখার কথা কখনও মাথাতেই আসেনি।
কিন্তু এই শাস্তির ভয়ই অনেক সময় মানুষকে দুঃসাহসী করে তোলে। নিজের শিক্ষক জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বলতে পারি, মারধর করে কখনও কাউকে ভালো করা যায় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দোষী ছাত্র জানতে পারে না তার দোষ কী। কারণ শিক্ষক তাকে ভুলটা না বুঝিয়ে মারের দিকে বেশি মন দেন। মার খেয়ে ছাত্রটি ভালো না হয়ে বরং আরও একরোখা হয়ে ওঠে।
আমাদের স্কুলে যদি কেউ লেট করে আসত, তাহলে তাকে খুব অপমানজনক শাস্তি দেওয়া হত। সারাদিন ক্লাসে ঢুকতে না দিয়ে বাইরের সিঁড়িতে বসিয়ে রাখা হত। ছাত্রটির কাছে জানতেও চাওয়া হত না, তার দেরি হল কেন?
আমি অবশ্য বরাবরই স্কুল বাসে যেতাম, তাই কোনোদিন এই শাস্তি পেতে হয়নি। কিন্তু ক্লাস নাইনে, একদিন স্কুলবাস মিস হল। অগত্যা উঠে পড়লাম, এক প্রাইভেট বাসে। কিন্তু ডায়মন্ড হারবার রোডে যা জ্যাম, পি জির কাছাকাছি আসতেই বুঝলাম, আজ লেট অবধারিত। আর লেট মানেই সারাদিন সিঁড়িতে বসে থাকা। শুধু ছেলেরা হলে তাও কথা ছিল, কিন্তু কো-এড স্কুল! একগাদা মেয়ের সামনে! ছিঃ ছিঃ!
এমন সময় চোখে পড়ল, ‘রং’ সিনেমার পোস্টার। দিব্যা ভারতীর সিনেমা। দিব্যা অকালে মারা গিয়ে আমার হৃদয়ে দাগা দিয়েছিল। তার মৃত্যুর পরে রিলিজ করেছে এই সিনেমা। মনে হল, স্কুলের নিকুচি করেছে। কে যাবে সিঁড়িতে বসতে? তাই বাস থেকে না নেমে সোজা চলে গেলাম ধর্মতলায়। রং দেখতে।
কিন্তু সেখানে, গিয়ে এক কেলো। ধর্মতলার সিনেমা হলগুলো তখনও ভালো ভাবে চিনি না। কোন সিনেমায় রং চলছে খুঁজছি, এমন সময় তেড়ে বৃষ্টি এলো। স্কুল বাসে আসি যাই, তাই সঙ্গে ছাতা ছিল না। কোনও দোকানের তলায় দাঁড়াব তাতেও লজ্জা করছে। যদি কেউ প্রশ্ন করে, “কি খোকা এই বয়সে স্কুল কেটে সিনেমা দেখতে এসেছ?” তাই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই খুঁজতে লাগলাম, কোন হলে দিব্যা ভারতীর সঙ্গে দেখা হবে। হলের অন্ধকারে তো কেউ বুঝতে পারবে না, আমি স্কুল পালিয়েছি।
যদি কেউ বলেন স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখা আমার উচিত হয়নি, তা হলে বলব দোষটা আমার নয়। যদি ওই সিঁড়িতে বসার শাস্তি না থাকত তা হলে আমি স্কুলেই যেতাম, একটু লেট হলেও যেতাম।
সুস্মিত সরকার,
শিক্ষক, দোস্তপুর হাইস্কুল, দঃ ২৪ পরগণা

